বাংলাদেশ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে নতুন করে উত্তেজনার ছোঁয়া। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের মধ্য দিয়ে পারস্য উপসাগরীয় ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ এখন জ্বলছে। হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় হতাহত হয়েছেন কয়েকশ মানুষ। তাতে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি। উভয়পক্ষ যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ানোর প্রস্তুতি নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য এখন বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতম অধ্যায়ের মুখোমুখি। এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথকেও প্রভাবিত করতে পারে। কালো ধোঁয়া আর উত্তাপের সঙ্গেই সারা বিশ্ব নতুন ভাবনায় আছে। ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি হলে এর প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার মতো দূরবর্তী অঞ্চলেও পড়বে।
বাংলাদেশ যদিও সরাসরি যুদ্ধের অংশ নয়, তবু দেশের অর্থনীতি ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে। প্রত্যক্ষ প্রভাবের তুলনায় পরোক্ষ প্রভাব আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ইতিমধ্যেই ভঙ্গুর। করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব অনুভূত হয়েছে। তার আগে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে লুটপাট ও অর্থ পাচারের কারণে অর্থনীতি তলানিতে পৌঁছেছে। ক্ষমতার পালাবদলের পরও দেশের অর্থনীতিতে গতি ফেরেনি। বিদেশি ঋণের বোঝা ও মূল্যস্ফীতির চাপ দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পুনরায় উত্তেজনা নতুন চ্যালেঞ্জ যোগ করেছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, তার প্রভাব তত বাড়বে। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, জ্বালানি তেল, রেমিট্যান্স প্রবাহ, বিমান পরিবহন ও শেয়ার বাজারে প্রভাব পড়তে পারে ব্যাপকভাবে। ডলারের দাম বেড়ে গেলে সার্বিক আমদানি-রপ্তানির তাত্ক্ষণিক টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এসব পরিস্থিতি সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।
গতকাল রোববার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সচিবালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন। এছাড়া বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির বলেন, “বাংলাদেশে জ্বালানির ওপর আপাতত কোনো শঙ্কার বিষয় নেই। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা সরকারের অগ্রাধিকার। বিশেষ করে বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।”
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনার প্রেক্ষিতে দেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং বিশেষ করে জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, “এ মুহূর্তে আমাদের যে স্টক রয়েছে, তা নিয়ে তেমন কোনো অসুবিধা হবে না। তবে সংকটের সময়ে কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি আমরা আগেও দেখেছি। জ্বালানি ক্ষেত্রে কিছু ওঠানামা হতে পারে, তবে এ বিষয়ে আমাদের প্রস্তুতি মোটামুটি ভালো।”
অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ বলেন, “ইরানে হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে বড় শঙ্কা জ্বালানি তেলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় যদি সরবরাহ বিঘ্নিত হয় বা হরমুজ প্রণালি ঝুঁকির মুখে পড়ে, তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাবে। বাংলাদেশ শতভাগ আমদানিনির্ভর, তাই এ মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সরাসরি দেশের উৎপাদন ও পরিবহন খাতে অনুভূত হবে।”
তিনি আরও বলেন, “তেলের দাম বেড়ে গেলে সবকিছুর দাম বাড়বে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও কঠিন হয়ে যাবে। মূল্যস্ফীতি তীব্র হবে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হবে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে। আমাদের ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ইতিমধ্যেই নেতিবাচক। যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বাড়লে ঘাটতি আরও বিস্তৃত হবে। তেলের উচ্চমূল্যের ফলে ডলারের চাহিদা বেড়ে যাবে, যা টাকার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। এর ফলে বিনিময় হার অবনতি করবে এবং আমদানি ব্যয় ও ঋণ পরিশোধ কঠিন হবে।”
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি এবং বহুমুখী হতে পারে। তবে এ সংকটের গভীরতা নির্ভর করবে যুদ্ধের স্থায়িত্ব এবং বিস্তারের ওপর। যদি যুদ্ধ দ্রুত থেমে যায়, প্রভাব হয়তো খুব প্রকট হবে না। কিন্তু এটি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশ বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষভাবে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হওয়া নিশ্চিত করতে হবে।”
বাণিজ্যে প্রভাব ও হরমুজ প্রণালির উদ্বেগ:
যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদেশের বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য অত্যন্ত সীমিত। করোনার পর সাময়িকভাবে কিছুটা বাড়লেও দুই অর্থবছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ-ইরানের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১ কোটি ডলারের সামান্য বেশি, যার বড় অংশ বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি। বিপরীতে ইরান থেকে আমদানি কম এবং মাঝে মাঝে প্রায় শূন্যের কোঠায় থাকে।
ইপিবির তথ্যমতে, বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ইরানে ১ কোটি ৯ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে পাটের সুতা ছিল ১ কোটি ৮ লাখ ৩২ হাজার ৮৯৮ ডলার, নিট পোশাক ৯৫ হাজার ৩১০ ডলার এবং ওভেন পোশাক ৯ হাজার ৩৫১ ডলার। এর আগের বছরগুলোর তুলনায় রপ্তানি ওঠানামা দেখেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি ছিল ১ কোটি ৫৯ লাখ ডলার, পরের বছর কমে ১ কোটি ১৯ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি বেড়ে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার হয়, আবার ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে ১ কোটি ৫৪ লাখ ডলারে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইরান থেকে ৫ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। তার আগের তিন বছর দেশে ইরান থেকে কোনো আমদানি হয়নি। ২০২০-২১ অর্থবছরে সামান্য ৩ লাখ ডলারের পণ্য এসেছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক দশক আগে আমদানি তুলনামূলক বেশি ছিল; ২০১০-১১ অর্থবছরে ৪৪৯ কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়, পরের বছর কমে ৯৯ কোটি টাকায় নেমে আসে।
নিট পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রসহ তাদের মিত্রদেশের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সঙ্গে ব্যাংকিং জটিল। এছাড়া ইরান থেকে আমাদের দেশে ক্রেতার আগমনও সীমিত। এজন্য সরাসরি তৈরি পোশাক রপ্তানি কম হয়।”
তিনি আরও বলেন, “ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে পরোক্ষ ক্ষতি অনেক বেশি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবও আমরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় জাহাজে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাবে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপের জন্য যেসব জাহাজ যাতায়াত করে, তারা এখন ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিক ঘুরে যেতে বাধ্য।” মোহাম্মদ হাতেম যোগ করেন, “মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় কার্গো বিমানের চলাচলও ব্যাহত। জরুরি পণ্যের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হবে। তেল ও এলএনজি আমদানি ধীর হবে। সব মিলিয়ে আমরা ভবিষ্যতে আরেকটি বড় সংকট দেখতে পারছি।”
রপ্তানি ও শ্রমবাজারে সম্ভাব্য প্রভাব:
বাংলাদেশ গার্মেন্ট প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, “আমরা একটি রপ্তানিনির্ভর দেশ। তাই এই যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা করা অত্যাবশ্যক, বিশেষ করে পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য।” তিনি উদাহরণ টানেন, “যুদ্ধের কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমবে, ফলে পোশাকের মতো পণ্যে কম ব্যয় হবে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, কারণ বাংলাদেশ তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তৃতীয়ত, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যদি ব্যবসায়ীদের ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বিকল্প নৌপথ বেছে নিতে হয়, সামগ্রিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
মাহমুদ হাসান খান আরও বলেন, “আগে বাংলাদেশি পোশাক ব্যবসায়ীরা ভেবেছিলেন ইউক্রেন যুদ্ধ দুই সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে। কিন্তু সেই যুদ্ধ এখন চার বছর ধরে চলছে। এখন যদি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হয়, কুয়েত, ইরাক, ইরান, বাহরাইন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রপ্তানি বাজার মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।”
রেমিট্যান্স ও শ্রমবাজারে ঝুঁকি:
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলা ও ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের কর্মসংস্থান প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া রেমিট্যান্স প্রবাহও কমতে পারে। প্রবাসী শ্রমিকদের প্রায় ৬০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে, এবং এখান থেকে আসে দেশের মোট রেমিট্যান্সের ৪৯ শতাংশ।
ইরান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েত, বাহরাইন, ইয়েমেন। এই দেশগুলোতে প্রায় ৪০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বন্ধ হতে পারে এবং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধাক্কা পড়বে।
জনশক্তি রপ্তানিকারকের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মোবারক উল্লাহ শিমুল বলেন, “যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে, শ্রমিকরা নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরবেন। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা পড়বে। সরকারের উচিত প্রথমে প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে হটলাইন চালু করে শ্রমিকদের খোঁজখবর রাখা ও নির্দেশনা দেওয়া জরুরি। এছাড়া ফেরত আসা শ্রমিকদের পুনরায় প্রেরণ ও নতুন শ্রমিক পাঠানোর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক রয়েছেন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। এছাড়া আকাশপথে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হলে শ্রমিকদের যাতায়াত এবং রেমিট্যান্স প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্ক এবং সাবধানতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।”
মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের জ্বালানি তেল ও এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) প্রধান উৎস। যুদ্ধ চললে দেশের জ্বালানির দাম ও সরবরাহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়, যার অধিকাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়ার দেশ থেকে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, “আগামী জুন পর্যন্ত পরিশোধিত তেলের কোনো সমস্যা নেই। আমরা আপাতত নিরাপদে রয়েছি। এই তেল মালয়েশিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আসছে, যেখানে হরমুজ প্রণালির কোনো প্রভাব নেই। তবে অপরিশোধিত তেলের উৎস সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত হওয়ায় বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। আপাতত জ্বালানি রিজার্ভে কোনো সংকট নেই।”
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এলএনজি আমদানিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশের বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি হয়, যার মধ্যে কাতার থেকে আসে ৪০ লাখ টন। বর্তমানে বছরে ২,৬৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়, এর মধ্যে সাড়ে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আকারে আসে। গত বছর এই আমদানি ব্যয় হয়েছিল ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
ডেলটা এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হলে তেলের দাম, এলপিজি পরিবহন ও আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ হবে।”
বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান হারুন-উর-রশিদ বলেন, “বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় সবসময় প্রভাবিত হয়। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বাংলাদেশের পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। ইয়েমেনের হুতিদের হামলার কারণে লোহিত সাগর দিয়ে পণ্য পরিবহন ইতিমধ্যেই কমানো হয়েছে। যদি রাশিয়া ও চীনও এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

