অর্থনীতির আকার দ্রুত বাড়লেও দেশের পুঁজিবাজার সেই অনুপাতে বিস্তৃত হয়নি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও অবকাঠামো অর্থায়নে ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভারসাম্যহীনতা কমাতে পুঁজিবাজারকে গভীর, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামোয় রূপান্তর অতীব জরুরি।
আজ ৩ মার্চ ২০২৬ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি সম্প্রসারিত হলেও পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। এতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস সীমিত থেকে গেছে।
জিডিপি বাড়লেও বাজার মূলধনে গতি কম। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ছিল ১৯৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে ৪৬০ থেকে ৪৭০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে পৌঁছেছে। একই সময়ে ব্যাংক খাতের সম্পদ ১০ দশমিক ৩১ ট্রিলিয়ন টাকা থেকে ২০২৪ সালের জুন নাগাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৪১ ট্রিলিয়ন টাকায়।
অন্যদিকে শেয়ারবাজারের বাজার মূলধন ২০১৫ সালের ৩ দশমিক ২৯ ট্রিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৭ দশমিক ১৪ ট্রিলিয়ন টাকায় উন্নীত হয়েছে। তবে জিডিপির তুলনায় বাজার মূলধনের অনুপাত এখনো ১২ শতাংশের নিচে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি বাজারের গভীরতা সীমিত থাকারই ইঙ্গিত দেয়।
ব্যাংক নির্ভর অর্থায়নে ঝুঁকি বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি শিল্পঋণ মূলতঃ স্বল্পমেয়াদি আমানতের ভিত্তিতে বিতরণ হচ্ছে। এতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য ও মেয়াদজনিত চাপ তৈরি হয়। ঋণশৃঙ্খলা দুর্বল হলে খেলাপি বাড়ার ঝুঁকিও থাকে। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার থাকলে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশি জবাবদিহির মধ্যে আসতে হয়, এতে স্বচ্ছতা বাড়ে; একই সঙ্গে পরিবারভিত্তিক সঞ্চয় উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারের দুর্বলতা কেবল অর্থনৈতিক সূচকের ওঠানামার ফল নয়। নেতৃত্বের ঘাটতি, নীতির ধারাবাহিকতা না থাকা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং বাজার বাস্তবতার সঙ্গে নীতির অসামঞ্জস্য—এসব কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কার্যকর বাজার গড়তে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহের কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। বন্ড, প্রকল্পভিত্তিক আর্থিক উপকরণ ও বিভিন্ন ফান্ডের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ বাড়ানো গেলে ব্যাংকের ওপর চাপ কমবে।
ঋণবাজার ও সরকারি সিকিউরিটিজের সংযোগ খুবই জরুরি। উন্নত দেশে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড বাজার বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশে সরকারি সিকিউরিটিজ বাজার থাকলেও তা পুঁজিবাজারের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বিত নয়। এই সংযোগ জোরদার করা হলে ঋণবাজার শক্তিশালী হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের পথ সহজ হবে।
প্রযুক্তিনির্ভর তদারকিতে জোর দিতে হবে। পুঁজিবাজারে রিয়েল-টাইম নজরদারি, অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্তে অ্যালগরিদম ব্যবহার, ইনসাইডার ট্রেডিং পর্যবেক্ষণ এবং তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক তদারকি চালু করার সুপারিশ করা হয়েছে। মূল্য সংবেদনশীল তথ্য একীভূত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা হলে সব বিনিয়োগকারী একই সময়ে সমান তথ্য পাবে।
নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম আলাদা করলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হবে। লাইসেন্স, আইপিও অনুমোদন, বন্ড নিবন্ধন ও করপোরেট অ্যাকশনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
ভালো কোম্পানি আনতে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। দেশের অনেক বড় ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান এখনো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। এতে বাজারের পরিধি ও তারল্য সীমিত রয়েছে। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়া সহজ করা, ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ কাঠামো তৈরি এবং বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য বাস্তবসম্মত প্রণোদনা দিলে বাজার বিস্তৃত হতে পারে।
ডেরিভেটিভ ও হেজিং পণ্যের মতো আধুনিক আর্থিক উপকরণ চালুর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রবেশ, পরিচালনা ও প্রস্থান—এই তিন ধাপের প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। ডিজিটাল কেওয়াইসি, দ্রুত হিসাব খোলা ও নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে বিদেশি মূলধন প্রবাহ বাড়তে পারে।
করনীতির সমন্বয় করা প্রয়োজন। ব্যাংক আমানত বা সঞ্চয়পত্রে তুলনামূলক বেশি সুবিধা থাকলে শেয়ার ও বন্ডে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহ কমে যায়। তাই করকাঠামোকে মূলধন গঠনের লক্ষ্য অনুযায়ী সমন্বয়ের সুপারিশ করা হয়েছে। শেয়ার ধারণকালের ভিত্তিতে করসুবিধা, লভ্যাংশ করহার সমন্বয়, দ্বৈত কর কমানো এবং করপোরেট বন্ড ইস্যুতে ব্যয় যৌক্তিক করার প্রস্তাব রয়েছে।
তৈরি পোশাকের বাইরে সিন্থেটিক ফাইবার, রিসাইকেলড টেক্সটাইল ও বিকল্প উপকরণভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ বাড়লে নতুন কোম্পানি বাজারে আসতে পারে। এতে বাজারের মান উন্নত হবে। অবকাঠামো খাতে পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থায়ন বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহ সহজ হবে। প্রকল্পভিত্তিক বন্ড ও সম্পদ মনিটাইজেশনের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ তোলা সম্ভব বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিকল্প বিনিয়োগ খাতের সম্প্রসারণ করা জরুরি। প্রাইভেট ইকুইটি, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও গ্রোথ ফান্ডের মতো বিকল্প বিনিয়োগ খাত উন্নয়ন করলে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও রপ্তানিমুখী শিল্প দীর্ঘমেয়াদি মূলধন পেতে পারে। একই সঙ্গে ক্লিয়ারিং, সেটেলমেন্ট ও ডিপোজিটরি ব্যবস্থার দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
বলা যায় সমন্বিত নীতিই আস্থার ভিত্তি। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন কেবল শেয়ারদরের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ নয়। এটি একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। বাজেট, করনীতি ও মুদ্রানীতির সঙ্গে সমন্বয় রেখে দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি করা হলে বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীল দিকনির্দেশনা পাবেন।
ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের মধ্যে অর্থায়নের ভারসাম্য পুনর্গঠন করা গেলে আর্থিক ব্যবস্থার ঝুঁকি বণ্টন আরও কার্যকর হবে। সমন্বিত ও ধারাবাহিক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের পুঁজিবাজার ধীরে ধীরে গভীর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে।

