বাংলাদেশের শ্রমবাজার অনেকটাই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। মোট অভিবাসী শ্রমিকের ৬৭ শতাংশই যান সৌদি আরবে। এরপর কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্দানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করেন লাখ লাখ বাংলাদেশি। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় এই বিশাল শ্রমবাজার এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী অবস্থান করছেন। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পাল্টা হামলায় অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে প্রবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। অনেকেই ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। আকাশসীমা বন্ধ বা সীমিত থাকায় ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
ইতোমধ্যে আরব আমিরাতে একজন ও বাহরাইনে একজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। কুয়েতে চারজন ও বাহরাইনে তিনজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এতে প্রবাসী পরিবারগুলোতেও উদ্বেগ বাড়ছে।
রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক রপ্তানি—এই দুই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৫ সালে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩২.৮ বিলিয়ন ডলার, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই প্রবাহে ধাক্কা আসতে পারে। শ্রমিকেরা কাজ হারালে বা দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হলে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, যুদ্ধ যদি স্বল্পমেয়াদি হয়, তাহলে শ্রমবাজারে বড় প্রভাব পড়বে না। বরং পুনর্গঠনের কাজে শ্রমিকের চাহিদা বাড়তে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে বড় ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়বে। আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় অনেকেই দেশে ফিরতে চাইবেন। সে ক্ষেত্রে সরকারকে আগেভাগেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
অধ্যাপক ইমতিয়াজ আরও বলেন, বাংলাদেশের শ্রমবাজার মূলত আনস্কিলড ও সেমি-স্কিলড শ্রমিকনির্ভর। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া এসব শ্রমিকের চাহিদা কম। জাপান বা ইউরোপ দক্ষ শ্রমিক চায়। তাই দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প বাজার ধরতে হলে দক্ষ কর্মী তৈরিতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)-এর যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামও একই মত দেন। তিনি বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে নতুন শ্রমিক যাওয়ার সুযোগ কমবে, অনেকেই চাকরি হারাতে পারেন। এতে রেমিট্যান্সে বড় ধাক্কা আসবে। সরকারকে মালয়েশিয়া, জাপান, কোরিয়া ও ইউরোপের বাজার ধরতে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩১ হাজার ১৪৪ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৯ জন, অর্থাৎ ৬৭ শতাংশই গেছেন সৌদি আরবে। কাতারে গেছেন এক লাখ সাত হাজার ৫৯৬ জন, সিঙ্গাপুরে ৭০ হাজার ১৭৭ জন, কুয়েতে ৪২ হাজার ২৪১ জন, মালদ্বীপে ৪০ হাজার ১৩৯ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৩ হাজার ৭৫২ জন এবং জর্দানে ১২ হাজার ৩০১ জন।
চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেও সৌদি আরবই প্রথম স্থানে রয়েছে। এরপর সিঙ্গাপুর, কাতার, কুয়েত, জর্দান ও আরব আমিরাত।
মালয়েশিয়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার। বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। তবে ২০২৪ সালের জুনে অতিরিক্ত খরচ ও সিন্ডিকেট জটিলতার কারণে শ্রমবাজারটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৫ সালে সেখানে গেছেন মাত্র তিন হাজার ৬৬ জন।
দক্ষতার ঘাটতির কারণে সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য দেশে সুযোগ সীমিত হচ্ছে। ফলে নতুন বাজার সম্প্রসারণে অগ্রগতি ধীর।
মধ্যপ্রাচ্যের বাংলাদেশি দূতাবাসগুলো প্রবাসীদের সামরিক স্থাপনার আশপাশ থেকে দূরে থাকতে ও নিরাপদ স্থানে অবস্থান করতে পরামর্শ দিয়েছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় কল সেন্টার ও হটলাইন চালু করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, প্রবাসীরা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। টিকিট রিইস্যু বা ভিসা জটিলতা নিরসনে সরকার উদ্যোগ নেবে। যাঁদের বাড়ি দূরে, তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
যদি সংঘাত দ্রুত থেমে যায়, তাহলে প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সময় বিকল্প বাজার খোঁজা, দক্ষ শ্রমিক তৈরি এবং প্রবাসী সুরক্ষা পরিকল্পনা জোরদার করার।
মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতার এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য বড় সতর্কবার্তা—একটি অঞ্চলে অস্থিরতা মানেই পুরো অর্থনীতিতে ঝাঁকুনি।

