চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) সরকার পরিচালন ও উন্নয়ন খাত মিলিয়ে মোট ব্যয় করেছে দুই লাখ ৫৮ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। এ থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন, বিভিন্ন ভর্তুকি এবং ঋণের সুদ পরিশোধে খরচ হয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের প্রায় ৫৮ শতাংশ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ বাজেট বাস্তবায়ন প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রতিফলিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচিত সরকারকে অর্থবছরের বাকি সময়ে এই হিসাবের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রথম ছয় মাসে সার্বিক বাজেট বাস্তবায়ন হার দাঁড়িয়েছে ৩২.৬৮ শতাংশে। এর তুলনায় গত অর্থবছরের একই সময়ে এই হার ছিল ২৮ শতাংশ। পরিচালন ব্যয়ের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সার্বিক বাস্তবায়ন হার বৃদ্ধি করেছে, তবে উন্নয়ন খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
চলতি অর্থবছরে মোট বাজেট ঘোষণা করা হয়েছিল সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে পরিচালন খাতের বরাদ্দ পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা। প্রথম ছয় মাসে পরিচালন খাতে ব্যয় হয়েছে দুই লাখ ২০ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৪১.১৮ শতাংশ এবং মোট ব্যয়ের ৮৫.৩৮ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে পরিচালন খাতে ব্যয় ছিল এক লাখ ৮৭ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা।
উন্নয়ন খাতে ছয় মাসে ব্যয় হয়েছে ৩১ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। মোট বরাদ্দ দুই লাখ ৪৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে উন্নয়ন খাতের ব্যয় ছিল ৩৯ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগ জানায়, রাজনৈতিক পরিবর্তন, প্রকল্প স্থগিত ও পুনর্মূল্যায়ন, এবং ব্যয় সাশ্রয়ী পদক্ষেপের কারণে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো সম্ভব হয়নি। সরকারি ব্যয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে চলতি অর্থবছরে ব্যয় সাত হাজার কোটি টাকা কমানো হয় এবং একাধিক প্রজ্ঞাপন জারি করে সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পরিচালন ব্যয় বেড়েছে।
রাজস্ব ও পরিচালন ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা:
অন্তর্বর্তী সরকার ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া সংশোধিত বাজেটে পরিচালন ব্যয়ের চাপ কমাতে উন্নয়ন খাত থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কেটে ২৮ হাজার কোটি টাকা পরিচালন খাতে পুনর্বিন্যাস করে। এতে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ২২ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে পরিচালন খাতে ব্যয় হয়েছে দুই লাখ ২০ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা, যা প্রায় সমান রাজস্ব আয় দুই লাখ ২১ হাজার ৫৯১ কোটি টাকার সঙ্গে। এ সময়ে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকায়। ঘাটতি মেটাতে দেশি-বিদেশি ঋণ নিতে হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে দুই লাখ ২৩ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা। এনবিআরবহির্ভূত রাজস্ব থেকেও আয় হয়েছে মাত্র ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বিদায়ী অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মনে করান, রাজস্ব আদায় বাড়ানো সরকারকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
প্রথম ছয় মাসে ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৬৬ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা, মোট ব্যয়ের প্রায় ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে দেশীয় ঋণ ৫৬ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণ ৯ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে সুদ পরিশোধে ব্যয় ছিল ৬৪ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগের ঋণ বুলেটিন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। পরিচালন খাতের বড় ব্যয়ের মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ছয় মাসে ৩৪ হাজার ৬৪ কোটি টাকা, পেনশন বাবদ ১৩ হাজার ৬১ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন ভর্তুকি বাবদ ৩৭ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, রাজস্ব আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয়ও পূর্ণভাবে মেটানো যাচ্ছে না। সংশোধিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে পরিচালন ব্যয় বাড়ানো যৌক্তিক নয়। পরিচালন খাতের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, না হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার বাধাগ্রস্ত হবে।
নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত সাম্প্রতিক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বলা হয়, নতুন সরকার বড় অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব নিচ্ছে। প্রধান চ্যালেঞ্জ তিনটি—অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দুর্বলতা, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তা, এবং সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাজেট সংশোধন করে বাস্তবসম্মত কাঠামো তৈরি করা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা এখন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

