টানা আট মাস ধরে বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি অবনতি পেয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এ সময় রফতানি ৩.১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ রফতানি আয়ই দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি গঠন করে।
চলতি অর্থবছরের শুরুতে রফতানি খাতে ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা গিয়েছিল কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা ক্রমশ নিম্নমুখী হয়েছে। এর ফলে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, রফতানি খাত নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি। এই প্রতিবন্ধকতাগুলো কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও গুরুতর প্রভাব ফেলছে।
দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বন্দর ব্যবস্থাপনার জটিলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং ঋণ ও বিনিয়োগে মন্দাভাব রফতানি খাতকে চাপে রেখেছে। এছাড়া, পূর্ববর্তী মার্কিন প্রশাসনের উচ্চ পাল্টা শুল্কের প্রভাব বিশেষত তৈরি পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। এর পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে চাহিদা সংকোচনের কারণে রফতানি খাতে বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
অতীতের সমস্যা সমাধান না হওয়ায় রফতানি আয় কমতে থাকে, যা অর্থনীতিতে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও যুক্ত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের মূল্য বাড়িয়েছে। যদি এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়, তবে পরিবহন খরচ এবং জ্বালানি সরবরাহের সময়সীমা আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি বিবেচনা করলে, এ ধরনের আন্তর্জাতিক ঝুঁকি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার ৬০ শতাংশের বেশি বিদেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। এ ক্ষেত্রে প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশ। স্বাভাবিকভাবে এই পরিস্থিতি রফতানি খাতের সামগ্রিক চিত্র পুনর্মূল্যায়নের দাবি জাগায়।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ বলছে, রফতানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হওয়ার প্রধান কারণ হলো তৈরি পোশাক রফতানি হ্রাস। দেশের মোট রফতানির ৮০ শতাংশের বেশি এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তৈরি পোশাক খাতে যে কোনো অভিঘাত পুরো রফতানি খাতকে প্রভাবিত করে। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের রফতানি কাঠামোকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। বর্তমানে নতুন সরকারের জন্য প্রয়োজন রফতানি খাতের সমস্যাগুলো সমাধানে সামগ্রিকভাবে মনোযোগ দেওয়া। বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, ধারাবাহিকভাবে রফতানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা কোনো স্বল্পমেয়াদি সংকট নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এটিই আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে। টেকসই রফতানি খাত গড়তে হলে এমন পণ্যের উৎপাদন ও রফতানি বাড়াতে হবে, যার চাহিদা যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক সংকটে কমবে না। উদাহরণ হিসেবে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, ওষুধ, ডিজিটাল সেবা ও নার্সিং খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় ভোক্তারা বিলাসপণ্য থেকে সরে গেলেও এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ে। বিশ্বব্যাপী এমন পরিস্থিতির উদাহরণ ছিল ২০২২ সালে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।
একই সঙ্গে বাজার বৈচিত্র্য বাড়ানোও অপরিহার্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের রফতানিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চক্রের প্রতি সংবেদনশীল করে তুলেছে। তাই পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উদীয়মান বাজারে সক্রিয় বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করা জরুরি। যদিও এসব পদক্ষেপ সময়সাপেক্ষ, তবুও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।
শিল্প বিনিয়োগে মন্দাভাবও রফতানি হ্রাসের একটি প্রধান কারণ। মূলধন যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির এলসি নিষ্পত্তি কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এছাড়া ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ শিল্প অর্থায়নকে সীমিত করছে। এসব বিবেচনায় কিছু নীতিগত পদক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে বলা হয়েছে, রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা প্রাথমিক ধাপ।
তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে চামড়া, হালকা প্রকৌশল, ওষুধ, আইটি সেবা ও কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্যও সম্ভাবনাময়। দীর্ঘদিন ধরে এসব খাতের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও কার্যকর শিল্পনীতি ও প্রণোদনার অভাবে রফতানি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এই খাতগুলোর রফতানি বৃদ্ধির জন্য নতুন বাজার অনুসন্ধান, প্রযুক্তি সহায়তা, মান নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো, লজিস্টিক ও বন্দর দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দীর্ঘ লিড টাইম। এক ক্রয়াদেশ সরবরাহ করতে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের সময় বেশি লাগে। এর ফলে ক্রেতারা বিকল্প বাজার খুঁজে নেয়। বন্দর ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস প্রক্রিয়া ও মালামাল পরিবহনে সমন্বয় ছাড়া এই সমস্যা কাটানো সম্ভব নয়।
উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও শিল্প সহায়ক নীতিও অপরিহার্য। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি ও উচ্চ সুদহার অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য করেছে। রফতানি শিল্প পুনরুদ্ধারের জন্য পূর্বানুমানযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, টেকসই উৎস, প্রতিযোগিতামূলক অর্থায়ন সুবিধা এবং মূল্যস্ফীতি হ্রাস প্রয়োজন।
সর্বশেষে, এলডিসি উত্তরণের বাস্তবতা বিবেচনায় প্রতিযোগিতামূলক রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। শুল্ক সুবিধা কমে গেলে শুধু কম শ্রমমূল্যের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা সম্ভব নয়। প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ ও উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে দ্রুত অগ্রসর হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের রফতানি খাত একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তৈরি পোশাকে অতির্ভরতা, শিল্প বিনিয়োগে মন্দাভাব, জ্বালানি ও ঋণের চাপ, এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিতিশীলতা—এসব মিলিতভাবে রফতানি প্রবৃদ্ধিকে নিম্নমুখী করেছে। তাই শুধু সমস্যার মোকাবিলা নয়, কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়াই একমাত্র পথ।
ভবিষ্যতে রফতানি খাতকে টেকসই করতে হবে বৈচিত্র্য ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর জোর দিয়ে। নতুন বাজার, উচ্চমূল্যের পণ্য, প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং পূর্বানুমানযোগ্য শিল্প ও জ্বালানি নীতি নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক ঝুঁকি ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব কমাতে বৈচিত্র্যময় বাজার ও নিরাপদ সরবরাহ চেইন গড়ে তোলা জরুরি।
সংক্ষেপে, রফতানি পুনরুদ্ধার সম্ভব, যদি সরকার, শিল্প ও বাজার সক্রিয়ভাবে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়। শুধুমাত্র এতে বাংলাদেশের অর্থনীতি দৃঢ় হবে এবং এলডিসি উত্তরণের পর প্রতিযোগিতামূলক রফতানি কাঠামো নিশ্চিত হবে।

