বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ভোগভিত্তিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধি থেকে সরে এসে বিনিয়োগভিত্তিক, টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা।
আজ বুধবার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি ও ইংরেজি দৈনিক ডেইলি ষ্টারের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তিনি আরও পরামর্শ দেন, আগামী অর্থ বছরের বাজেট দেশের বর্তমান চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে তৈরি করা উচিত।
উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সরকারের ম্যান্ডেটের পাঁচটি ভিত্তিমূল তুলে ধরেন। এর মধ্যে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনরুদ্ধার গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ঋণের যে পাহাড় তৈরি হয়েছে, তা দেশের অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে। এই সংকট মোকাবেলায় অপচয় রোধ এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি জানান, সামাজিক সুরক্ষা খাতে স্বচ্ছতা আনতে সরকার ‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ড’ ব্যবস্থার পরিকল্পনা করছে। ডিজিটাল অবকাঠামোর মাধ্যমে এটি সহায়তার ক্ষেত্রে অপচয় কমাতে সহায়ক হবে।
এছাড়া, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোয় গুরুত্বারোপ করেন উপদেষ্টা। জ্বালানি খাতের অস্বচ্ছতা নিয়ে তিনি বলেন, বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি কমাতে ‘রিনেগোশিয়েশন’ ও ‘সিস্টেম লস’ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংকিং খাত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থায় গভীর সংস্কার প্রয়োজন। ব্যাংকের প্রকৃত স্বাস্থ্য যাচাইয়ের জন্য অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ শুরু হওয়ায় খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে।
তিনি জানান, গত সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ৩৫.৭ শতাংশে পৌঁছালেও ডিসেম্বরে নির্বাচনের আগে পুনঃতফসিলের কারণে তা কিছুটা কমেছে। খেলাপি ঋণ কমানো, পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ফেরাতে আইনি সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ড. খাতুন মূল্যস্ফীতিকে ‘সরবরাহজনিত সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতি সমন্বয় করা এবং বাজার তদারকি জোরদার করা জরুরি। মজুদদারি ও সিন্ডিকেট বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখতে হবে। তিনি আরও জানান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে স্থিতিশীল। জুলাই-জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২১.৭৬% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক। রপ্তানি খাত কেবল তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত বহুমুখীকরণের জাতীয় কৌশল গ্রহণের পরামর্শ দেন। বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কর কাঠামোর পূর্বাভাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ভালো নীতি গ্রহণ যথেষ্ট নয়, সঠিক বাস্তবায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ঔপনিবেশিক আমলের জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা সরকারের লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে।
তিনি সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম ডিজিটাল করার প্রস্তাব দেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও টেলিকমিউনিকেশন মন্ত্রণালয়ে বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা গ্রুপ গঠনের পরামর্শও দেন, যারা প্রতি তিন মাস অন্তর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করে সরকারকে পরামর্শ দিবে।
ফেবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি এ. কে. আজাদ বলেন, বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের গড় হার ৩৬% এবং সরকারি ব্যাংকে তা ৫০%। তিনি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি আরও জানান, গ্যাস সংযোগের অভাবে নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। সরকারি ব্যয় কমাতে অপ্রয়োজনীয় মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর হ্রাস এবং প্রশাসনিক সংস্কারেরও প্রস্তাব দেন। এ. কে. আজাদ দেশের ঋণের উচ্চ সুদহার ও জ্বালানি সংকটের কারণে স্থানীয় শিল্প বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

