মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। সৌদি আরবে জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় শোধনাগার ইরানের হামলার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। একই দিনে কাতার তার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন ও সরবরাহও স্থগিত করেছে। ফলে হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ করে, বন্ধ হয়ে গেছে।
এই প্রভাব দেশে এসে পৌঁছেছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, দেশের দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট, যা সরবরাহ করা হচ্ছিল ২৬৫–২৭০ কোটি ঘনফুট। গতকাল বুধবার থেকে সরবরাহ ২০ কোটি ঘনফুট কমিয়ে আনা হয়েছে। এতে সার ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের সরবরাহ কমানো হয়েছে। এর প্রভাব হিসেবে কিছু এলাকায় লোডশেডিং হতে পারে, রান্নার গ্যাস পেতে ভোগান্তি দেখা দিতে পারে।
দেশের জ্বালানি তেলের প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। অপরিশোধিত তেলের সবকটি সরবরাহ আসে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে। পরিশোধিত জ্বালানি বিভিন্ন দেশ থেকে আসে। গ্যাস চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ পূরণ করা হয় আমদানি করা এলএনজি দিয়ে, যার বেশিরভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধের কারণে আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, বর্তমান পরিস্থিতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও গুরুতর। তিনি বলেন, “সঙ্কট মোকাবিলায় সবাইকে সাশ্রয়ী হতে হবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ মার্চ পর্যন্ত ধরে রাখতে হলে সর্বত্র সাশ্রয়ী ব্যবহার জরুরি।”
মন্ত্রী জানান, ইফতার থেকে তারাবিহ পর্যন্ত এবং সাহরির সময় লোডশেডিং হবে না। খোলাবাজার থেকে বাড়তি জ্বালানি কেনার চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে এখনও তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। তিনি আশ্বাস দেন, সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা করা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ঈদের ছুটিতে শিল্পকারখানার কার্যক্রম কমে গেলে বিদ্যুতের চাহিদা কমবে, যা চাপ কিছুটা হ্রাস করবে।
গ্যাস সরবরাহে ভাটা পড়েছে:
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে দেশে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহ কমেছে। দেশের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল। বুধবার তা কমিয়ে ৭৫ কোটি ঘনফুটে নামানো হয়েছে। পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, এই হারে সরবরাহ ঈদের ছুটি পর্যন্ত ধরে রাখা যাবে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) এ বছর ১১৫টি এলএনজি কার্গো আনার পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে কাতার থেকে ৪০টি, ওমান থেকে ১৬টি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসবে। এছাড়া খোলাবাজার থেকে ৫৯টি কার্গো আনার কথা রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ স্থগিত রয়েছে।
নতুন আসা একটি কার্গো থেকে বুধবার এলএনজি নেওয়া হয়েছে। আরও তিনটি কার্গো ৫, ৯ ও ১১ মার্চ টার্মিনালে পৌঁছাবে। এ মাসে আরও পাঁচটি কার্গো আসার কথা রয়েছে, যার মধ্যে কাতার থেকে আসা দুটি কার্গো ১৫ ও ১৮ মার্চ। তবে কাতারের সঙ্গে যোগাযোগে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। অন্য উৎস থেকে এলএনজি আনার চেষ্টা চলছে। অস্ট্রেলিয়া ও অ্যাঙ্গোলা থেকে দুটি কার্গো আসার কথা রয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানান, প্রতিটি কার্গো নির্দিষ্ট সূচি মেনে আনা হয়। একদিন দেরি হলে ৭৮ হাজার ডলার জরিমানা দিতে হয়। এই মাসে দুটি কার্গো নির্দিষ্ট সময়ে আসবে না। তাই সরবরাহ কমিয়ে সাশ্রয় করে ঈদের ছুটি পর্যন্ত চালিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পূর্বে, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। এক সময় প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ৬০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। বাংলাদেশ ৩৬ ডলারে কিনলেও পরে আর কিনতে পারেনি। ওই বছরের জুলাই থেকে খোলাবাজার থেকে এলএনজি আমদানি সাত মাস বন্ধ থাকায় দেশে গ্যাসের সংকট দেখা দেয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে কমে লোডশেডিং হয়। বর্তমানে এলএনজির দাম ১০ ডলার থেকে বেড়ে ২৫ ডলারের উপরে চলে গেছে এবং আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত তেলের মজুত পর্যাপ্ত। বিপিসি জানিয়েছে, পেট্রল ১৬ দিন, অকটেন ৩০ দিনের মজুত রয়েছে। ফার্নেস তেলের মজুত ৭৬ দিনের। তাই আপাতত বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলের ঘাটতি নেই।
ডিজেল ঘাটতি বাড়ছে, জাহাজ আসতে দেরি করছে:
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে দেশের জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল, যা হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে আসে। বর্তমানে এই সরবরাহ বন্ধ। বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত তেল আসে চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বন্দর থেকে, যা সময়মতো আসছে।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, পেট্রলের মজুত আছে ১৬ দিন, অকটেন ৩০ দিনের, এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ফার্নেস তেলের মজুত ৭৬ দিনের। আপাতত এসব তেল নিয়ে উদ্বেগ নেই। তবে ডিজেলের মজুত মাত্র ১৪ দিন। বিপিসির সরবরাহ করা জ্বালানি তেলের প্রায় ৭৫ শতাংশ ডিজেল। চলতি সপ্তাহে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম দ্রুত বাড়ছে; ১ মার্চ ছিল ৮৮ ডলার, ৩ মার্চ বেড়ে ১৩৭ ডলার।
জাহাজে ডিজেল পৌঁছানোও বিলম্বিত হচ্ছে। ৪ মার্চের জাহাজ ৯ মার্চ আসতে পারে, ৬ মার্চের ৯ মার্চ, আর ৮ মার্চের ১০ মার্চ। বন্দরে তেল খালাসের সময় তিন দিনের গড় অনুযায়ী দাম পরিশোধ করতে হয়। একটি জাহাজের ডিজেলের দাম ২ কোটি ২০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে আড়াই কোটি ডলার হয়েছে। জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় এবং জাহাজ না পাওয়ায় সরবরাহে দেরি হচ্ছে।
এদিকে দেশে গ্যাসের সংকট আরও গুরুতর। এলএনজি সরবরাহ কমে ৭৫ কোটি ঘনফুটে নামানো হয়েছে, যা ঈদের ছুটি পর্যন্ত ধরে রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চীন, জাপান, পাকিস্তান ও ভারতের মতো দেশ গ্যাসের রেশনিং শুরু করেছে। ফলে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কিছুটা লোডশেডিং হতে পারে, তবে তা নিয়ন্ত্রণযোগ্য হবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম. তামিম বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে সাশ্রয়ী ব্যবহার ও চাহিদা নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। গ্যাস সংকটের তুলনায় তেলের ঘাটতি আপাতত সাময়িক।”
জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের নির্দেশনা:
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জনগণকে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে জানিয়েছে, দেশের জ্বালানি খাতে সাময়িক সংকট দেখা দিতে পারে। মন্ত্রণালয়ের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পবিত্র রোজার মাসে জনদুর্ভোগ এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহার এবং সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহার করার জন্য জনগণকে অনুরোধ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, খোলাবাজারে ডিজেল ও পেট্রল বিক্রয় না করার জন্য ব্যবসায়ী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তৎপর হতে হবে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে জ্বালানি পাচার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম. তামিম বলেন, “জ্বালানি তেলের চেয়ে গ্যাসের সংকট বেশি গুরুতর। বর্তমানে সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং বেশি দামে বিকল্প উৎস থেকে ক্রয়ই একমাত্র সমাধান। চীন, জাপান, পাকিস্তান ও ভারত ইতোমধ্যেই গ্যাসের রেশনিং শুরু করেছে। সাময়িক লোডশেডিং হতে পারে, তাই সবাইকে সাশ্রয়ে সহায়তা করতে হবে। যুদ্ধ দুই সপ্তাহের মধ্যে না বন্ধ হলে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”

