মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে বিশ্বে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। উপসাগরীয় ছয়টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থাকায় এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা, জ্বালানি ও শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা বেড়ে গেছে। সরাসরি প্রভাব পড়ছে এ অঞ্চলে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যেই দুবাইয়ে একজন এবং বাহরাইনে একজন বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হয়েছেন। আরও অনেকে আহত হয়েছেন। তাছাড়া, বহু শ্রমিক উড়োজাহাজের টিকিট কেটে থাকা সত্ত্বেও দেশে ফিরতে পারছেন না। বিপাকে পড়েছেন তারা যারা ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে ছুটিতে এসেছেন।
বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ কাজ করেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে। এই ছয়টি দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে। ২০২৫ সালে এই দেশগুলোতে প্রেরিত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ১৯ হাজার ৪৩৫। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই ছয়টি দেশে ৬০ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর জানান, “পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক প্রভাব পরবর্তীতে দেখা যাবে। তবে আশা করি, আমাদের শ্রমিকরা দীর্ঘমেয়াদে বড় সংকটে পড়বেন না। এর আগে কোভিডের সময়ও এমন পরিস্থিতি হয়েছিল। এখন সাময়িকভাবে রেমিট্যান্সে কিছু প্রভাব পড়তে পারে।”
গত বছর ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ছুটিতে এসেছিলেন আরব আমিরাত প্রবাসী রেজাউল করিম। তিন মাসের ছুটি শেষে চলতি (মার্চ) মাসের ১ তারিখ তার ফিরতি ফ্লাইট ছিল। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, “হঠাৎ ফ্লাইট বন্ধ হয়ে ঢাকা ফেরার সুযোগ হয়নি। এখন কবে পুনরায় ফ্লাইট দেওয়া হবে, কিছুই জানি না। সবার সঙ্গে কথা বলার পর জানতে পেরেছি, অন্তত ১৫-২০ দিন সময় লাগতে পারে। টাকা-পয়সাও শেষ, ঋণ করে চলছি।”
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে নিরাপত্তা ও কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় ছয়টি দেশে—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে—যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থাকায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
কাতারে প্রবাসী বিজয় তালুকদার বলেন, “আমার আকামার মেয়াদ শেষ হবে মার্চের ২০ তারিখ। এ সময়ের আগে যেতে না পারলে ভিসা নবায়ন করা যাবে না। পরে অবৈধ হয়ে যাবো। যদি কোম্পানি মেয়াদ না বাড়ায়, আমরা বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবো।” মধ্যপ্রাচ্যে থাকা শ্রমিকরা জানাচ্ছেন, ক্লিনারের মতো কাজে নিযুক্তরা নিরাপত্তা শঙ্কায় রয়েছেন। অন্যদিকে হোটেল, রেস্তোরাঁ, কারখানা ও বাসাবাড়িতে কাজ করা শ্রমিকরা নির্বিঘ্নে কাজ করলেও ছুটি পাননি।
“দুই শ্রমিক নিহত হওয়ার পর ভয় ও শঙ্কা বাড়লেও, বেশিরভাগ প্রবাসী এখনও তাদের ডিউটি পালন করছেন। ঈদ উপলক্ষে অনেক শ্রমিক আগে থেকে টিকিট কেটেও রেখেছেন। তবে চলমান যুদ্ধের কারণে তারা ঈদের আগে দেশে ফিরতে পারা অনিশ্চিত। বাহরাইনে থাকা প্রবাসী রিয়াদ হোসেন বলেন, “এখন পর্যন্ত ভালো আছি। তবে কাজের সময় ছাড়া বাইরে খুব কম যাই। ঈদ আসছে, কিন্তু দেশে বড় অংকের টাকা পাঠাতে পারছি না। ব্যাংক যাওয়া ঝামেলা, বিকাশেও বেশি টাকা পাঠানো ঝামেলা।”
সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে নির্মাণ, অবকাঠামো ও সেবা খাতে প্রকল্পের গতি কমে যেতে পারে। এতে নিম্ন ও আধাদক্ষ শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন। কাজের সময় কমানো, ওভারটাইম বন্ধ হওয়া বা চুক্তি নবায়ন না হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে তাদের আয় হ্রাস পেতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হলে দেশে পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণও কমতে পারে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি, ভোগব্যয় ও ব্যাংকিং খাতে চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর জানান, “পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক প্রভাব পরবর্তীতে দেখা যাবে। তবে আশা করি, শ্রমিকরা দীর্ঘমেয়াদে বড় সংকটে পড়বেন না। এর আগে কোভিডের সময়ও এমন পরিস্থিতি হয়েছিল। এখন সাময়িকভাবে রেমিট্যান্সে প্রভাব পড়তে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশের মানুষ ভিন্ন পথে টাকা পাঠাতে অভ্যস্ত। তবে যুদ্ধ আরও কিছুদিন বাড়লে আগামী দুই–তিন মাসে কর্মী প্রেরণ অনেক কমে যাবে। যারা ইকামা বা নিয়োগপত্র নবায়নের ঝামেলায় ভুগছেন, তাদের সমস্যা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষকে সমাধান করতে হবে। এই ক্ষেত্রে আমাদের হাইকমিশনের আন্তরিক ভূমিকা প্রয়োজন।”

