বাংলাদেশের বিদেশে শ্রমিক পাঠানো বছরের পর বছর ধরে চলমান একটি বাস্তবতা। দেশের তরুণ শক্তি কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাবে প্রায়শই বিদেশে পাড়ি জমান। গার্মেন্টস, নির্মাণ বা সেবাখাতের সীমিত বেতন‑চাকরি তাদের পরিবারকে স্বাবলম্বী করার সুযোগ দিতে যথেষ্ট নয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়ার কিছু দেশ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করার জন্য হাজার হাজার মানুষ প্রতিবছর দেশের বাইরে পাড়ি জমায়।
বিশ্বে জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ দেশ। গত ৩ বছর ধরে প্রতি বছর ১০ লাখের বেশি শ্রমিক বিদেশে পাঠানো বাংলাদেশি বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে ধরা হচ্ছে। ২০২৪ সালে মোট ১০ লাখ ১১ হাজার ৮৫৬ জন কর্মী বিদেশে গেছেন, যা বার্ষিক ভিত্তিতে দেশের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওই শ্রমিকরা ১৪১টি দেশে কর্মসংস্থান পেয়েছেন।
রেমিটেন্স মনিটরিং রিপোর্টিং ইউনিটের (RMMRU) ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছর ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে গেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মোট অভিবাসীর ৬৭ শতাংশ অর্থাৎ সৌদি আরবে গেছেন ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৯ জন। কাতারে গেছেন ১০ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৬ শতাংশ, কুয়েতে ৪ শতাংশ এবং মালদ্বীপেও ৪ শতাংশ শ্রমিক।
তবে ১৯৭৬ সাল থেকে বিদেশে প্রেরিত মোট কর্মীর হিসাব থাকলেও ফিরে আসা শ্রমিকদের সংখ্যা জানা নেই। ফলে এখন পর্যন্ত বিদেশে মোট কতজন কর্মী আছেন, তা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। গত বছর ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী শ্রমিক বিদেশে গেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ১.৯ শতাংশ বেশি।
বিদেশে শ্রমিকদের পাঠানো শুধু ব্যক্তিগত বা পরিবারের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়; এটি দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। রেমিটেন্সের মাধ্যমে দেশে হাজার হাজার পরিবারের জীবনমান উন্নত হয় এবং জাতীয় অর্থনীতিকেও সহায়তা করে। তবে প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশ কি সারাজীবন এই পথে চলতে থাকবে? অর্থাৎ কি অভিবাসী শ্রমিক প্রেরণ হবে চিরস্থায়ী সমাধান, নাকি দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও শিল্পবিনিয়োগের মাধ্যমে এই নির্ভরতা কমানো সম্ভব?
বাংলাদেশে বিদেশি শ্রমিক পাঠানো কেবল একটি নিয়মিত প্রবণতা নয়; এটি এখন দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের একটি অঙ্গ এবং বছরের পর বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে। এর পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ রয়েছে, যেগুলো না বদলালে এই প্রবণতা বন্ধ হওয়ার নয়; বরং পরবর্তী দশকে আরো দৃঢ় হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।
প্রথমত দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। বাংলাদেশের উন্নয়ন যথেষ্ট দ্রুত হলেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি শিক্ষাগত ও প্রযুক্তিগত চাহিদার সঙ্গে মেলেনি। গার্মেন্টস, নির্মাণ বা সেবাখাতের মতো খাতগুলোতে অনেক লোক কাজ করলেও সেখানকার বেতন ও সুযোগ সীমিত। বিশেষত গ্রামীণ ও অ‑শিক্ষিত তরুণদের জন্য উচ্চ বেতন‑চাকরি কম থাকায় বিদেশে উচ্চ বেতন ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের আকর্ষণ এতোটাই প্রবল যে, তারা দেশের ভিতরে কাজের অপেক্ষায় থাকে না। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতা, যে কারণে মানুষ বিদেশে যাওয়ার জন্য আগ্রহী থাকে।
দ্বিতীয়ত দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি শ্রমিক প্রেরণের প্রবণতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। অধিকাংশ বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে যাওয়া সত্ত্বেও তারা প্রাথমিক বা স্বল্পদক্ষ কাজেই নিয়োজিত হন। দেশের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে আধুনিক দক্ষতা দেওয়া না থাকায়, উন্নত প্রযুক্তি বা উচ্চ‑দক্ষতার চাহিদা পূরণে বাকি থাকায় শ্রমিকেরা উচ্চ বেতন‑চাকরিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে না। এর ফলে তারা আবারও বিদেশে কম‑দক্ষ কাজের সুযোগ খুঁজে বের করেন।
এর পাশাপাশি রেমিটেন্স‑ভিত্তিক অর্থনৈতিক নির্ভরতা একটি বড় কারণ। প্রবাসী শ্রমিকরা যে আয় দেশে পাঠান, তা শুধু পরিবারের সংসার চালাতে সাহায্য করে না; এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী- ২০২৫ সালে দেশে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলার, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সমপরিমাণ। বিশেষভাবে ২০২৫ সালে দেশে প্রেরিত রেমিট্যান্সের মোট পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৮১ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৯২ কোটি ৮৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার বা প্রায় ২২.০৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, প্রবাসী শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন এবং রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার শক্তির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে। এই রেমিটেন্স বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ এবং বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতি শক্ত রাখার পাশাপাশি গ্রামীণ পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নত করে। ফলে নীতিনির্ধারক ও পরিবার উভয়ই বিদেশে কর্মী প্রেরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। তবে এই রেমিটেন্স‑ভিত্তিক বাজারটি বিনিয়োগ বা দক্ষতা বৃদ্ধির বদলে বরং শ্রম অভিবাসনে নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ দেশে নিয়োগের সুযোগ না বাড়লে, দক্ষতা উন্নয়ন না হলে বা নতুন বিনিয়োগ না এলে এই প্রবণতা সহজেই কমবে না।
এই তিনটি কারণ কর্মসংস্থান সংকট, দক্ষতা অভাব এবং রেমিটেন্স‑ভিত্তিক অর্থনৈতিক নির্ভরতা — মিলেই শ্রমিক প্রেরণকে প্রতিনিয়ত সক্রিয় রেখেছে। যদি এগুলোর সমাধানে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক প্রেরণ দীর্ঘস্থায়ী একটি বিষয় হয়ে থাকতে পারে।
বাংলাদেশি শ্রমিক প্রেরণ দীর্ঘদিন ধরে চলমান থাকলেও এর সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ও ঝুঁকি জড়িত, যা শুধুই সংখ্যা বা পরিমাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি নির্ধারিত ফি থাকা সত্ত্বেও অনেক শ্রমিক ৪ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা বা তারও বেশি খরচ করে বিদেশে যান। এই অতিরিক্ত খরচের একটি বড় অংশ যায় দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর কাছে, যারা সুযোগের নামে অতিরিক্ত টাকা নেন কিন্তু প্রকৃত সাহায্য কম দেন। অনেক শ্রমিকের কাছে লিখিত নিয়োগপত্র নেই বা তা অসম্পূর্ণ থাকে। ফলে চাকরির শর্ত, বেতন, বাসস্থান বা চিকিৎসা সুবিধা স্পষ্ট থাকে না। মধ্যস্থতাকারীর প্রভাব এবং আইনগত সুরক্ষার ঘাটতি শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করতে বাঁধা দেয়।
অধিকাংশ শ্রমিক এক বা দুইটি দেশে বিশেষ করে সৌদি আরব পাঠানো হয়। বর্তমানে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ আজও কিছু নির্দিষ্ট দেশে কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে সৌদি আরবে। ২০২৫ সালে ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজের জন্য সৌদি আরব গেছেন, যা এক দেশের জন্য পাঠানো সর্বোচ্চ বিদেশি কর্মীর রেকর্ড। বর্তমানে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি সৌদি আরবে বসবাস ও কাজ করছেন। এরপর কাতার, সিঙ্গাপুর, কুয়েত ও মালদ্বীপের মতো গন্তব্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী কাজ করছেন।
এই ধরনের একতরফা নির্ভরতা একটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। যখন শ্রমিকদের সংখ্যা নির্দিষ্ট অঞ্চলে ঘন হয়ে থাকে, তখন সেই অঞ্চলের অর্থনৈতিক নীতি, ভিসা নিয়ম বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কোনো বড় পরিবর্তন ঘটলে তা সরাসরি বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ- যদি কোনো দেশ অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগে বিরতি ঘোষণা করে বা ভিসা কঠোর করে দেয়, তাহলে সেখানে কর্মী প্রেরণের সুযোগ দ্রুত কমে যেতে পারে। এই ধরনের নির্ভরতা শুধু নতুন চাকরির সুযোগ সীমাবদ্ধ করে না, বরং বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তাও বাড়ায়। কারণ কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর বেশি নির্ভরশীল রেমিটেন্স‑ভিত্তিক অর্থনীতিতে, ওই দেশের চাহিদা হঠাৎ কমে গেলে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও প্রবাসী আয়কে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
এমন পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। বিশেষ করে তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রেরিত নতুন শ্রমিকদের জন্য পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়েছে।
আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি প্রধান গন্তব্য দেশে নতুন কর্মী পাঠানো কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গালফ কো‑অপারেশন কাউন্সিল (GCC) ভুক্ত ছয়টি দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান — বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত। এছাড়া দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৫ শতাংশই আসে এই অঞ্চল থেকে। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে বড় ধরনের ধাক্কার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
অন্যদিকে কিছু দেশে বাংলাদেশের শ্রমিকদের ভিসা মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে আসায় উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অস্থির পরিস্থিতির কারণে বিদেশে নতুন করে শ্রমিক প্রেরণ প্রক্রিয়া অচল ও সংকীর্ণ হয়ে গেছে, যা রেমিট্যান্স ও প্রবাসী আয়েও সম্ভাব্য প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ সারাজীবন শুধুমাত্র অদক্ষ শ্রমিক পাঠাবে না, তবে জনশক্তি রপ্তানি দীর্ঘমেয়াদে চলতে থাকবে। সরকার ইতোমধ্যেই দক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিক বিদেশে প্রেরণের নীতি গ্রহণ করেছে এবং বর্তমানে প্রতিবছর ১১ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে যাচ্ছেন। তবে দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি এবং অদক্ষ জনশক্তির উপস্থিতি এখনও একটি চ্যালেঞ্জ।
সরকার শ্রমিক প্রেরণের মান উন্নয়নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। অদক্ষ শ্রমিকের বদলে দক্ষ ও আধা-দক্ষ কর্মী প্রেরণের জন্য প্রশিক্ষণ ও কারিগরি শিক্ষায় জোর দেওয়া হচ্ছে। নতুন বাজারের সম্ভাবনা খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা চলছে। শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয় ইউরোপ ও অন্যান্য দেশে বাংলাদেশের শ্রমিকদের চাহিদা বৃদ্ধির জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছে, তাই তাদের অধিকার সুরক্ষায় আইন ও নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগও রয়েছে।
এছাড়া সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। একক মাইগ্রেশন প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে; যা আবেদন, নিয়োগ এবং অন্যান্য তথ্য এক জায়গায় সহজে পাওয়া সম্ভব। বিদেশে কর্মীদের তথ্য পরিস্কারভাবে সংগ্রহ ও পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দেশে শ্রম চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক (বাই-ল্যাটারাল এগ্রিমেন্ট) স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপ এখনও পুরোপুরি স্থায়ী দিকনির্দেশনা বা অভিবাসন কাঠামোর বড় সংস্কার হিসেবে দাঁড়ায়নি, বিশেষত দক্ষ কর্মী প্রেরণ এবং মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে।
ভবিষ্যতের দিকে নজর দিলে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে অদক্ষ শ্রমিক প্রেরণ কমিয়ে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকার এখন দক্ষ ও আধা-দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর ওপর মনোনিবেশ করছে। বিশ্ববাজারে চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি ও টেকনিক্যাল শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রমিক প্রেরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যদিও অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা পুরোপুরি শেষ হয়নি, ভবিষ্যতে দক্ষ শ্রমিকদেরই প্রাধান্য দেওয়া হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়াতেও শিক্ষিত ও দক্ষ শ্রমিক প্রেরণের প্রবণতা বাড়ছে। সরকার কারিগরি শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ উন্নয়নের মাধ্যমে শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে কাজ করছে এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার জন্য নীতিমালা প্রয়োগ করছে, যেমন বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন-২০১৩।
সারসংক্ষেপে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে অদক্ষ শ্রমিক প্রেরণ কমিয়ে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতকে আরও শক্তিশালী এবং টেকসই করবে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমিক প্রেরণ দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এসেছে। এটি শুধু হাজার হাজার পরিবারের জীবিকা নিশ্চিত করছে না, বরং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার আয়েও বড় ভূমিকা রাখছে। তবে চলমান অভিবাসী প্রেরণ শুধুমাত্র সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল নয়; এতে ঝুঁকি, নিরাপত্তা সমস্যা, উচ্চ খরচ এবং নির্দিষ্ট দেশের ওপর একতরফা নির্ভরতার মতো সমস্যা জড়িত। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা এবং বিশ্ববাজারের পরিবর্তন এই ঝুঁকিকে আরও প্রমাণ করেছে।
তবে ভবিষ্যতের ধারা দেখাচ্ছে যে বাংলাদেশ সারাজীবন অদক্ষ শ্রমিক প্রেরণে নির্ভর করবে না। সরকার ধীরে ধীরে দক্ষ এবং আধা-দক্ষ জনশক্তি প্রেরণে মনোনিবেশ করছে, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রমিকদের প্রবাসে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং নতুন বাজার অন্বেষণ ও নিরাপদ অভিবাসনের জন্য নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অর্থাৎ অদক্ষ শ্রমিকের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিই বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতের ভবিষ্যতের মূল প্রবণতা।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, বাংলাদেশ সারাজীবন শুধু বিদেশি লেবার পাঠাবে না; বরং জনশক্তি রপ্তানির ধরন পরিবর্তন করে দেশীয় দক্ষতা বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে টেকসই এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার দিকে এগোচ্ছে। এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তবে বৈদেশিক কর্মসংস্থান শুধু আর্থিক সুবিধা নয়, দেশের স্থিতিশীলতা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক উন্নয়নের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবেও পরিণত হবে।

