দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখন কয়েকটি বড় চাপের মুখে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ, রাজস্ব আদায়ে দীর্ঘদিনের ঘাটতি এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি—এই চারটি বিষয়কে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত সর্বশেষ অর্থনৈতিক হালনাগাদ ও পূর্বাভাস প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন বলছে, অর্থনীতির কিছু খাতে ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে এসব কাঠামোগত সমস্যার সমাধান জরুরি। এ পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের জন্য কয়েকটি নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে।
জিইডির মতে, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী করা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতেও মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কমেনি। জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৫৮ শতাংশ, যা আগের মাসে ছিল ৮.৪৯ শতাংশ। চালের দাম কিছুটা কমায় খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে সাময়িক স্বস্তির ইঙ্গিত মিলেছিল। তবে মাছ, ফল ও সবজির দাম বাড়ায় খাদ্য ব্যয় আবারও বেড়েছে। জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.২৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ডিসেম্বরে ছিল ৭.৭১ শতাংশ। একই সময়ে অখাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯.১৩ শতাংশ থেকে ৮.৮১ শতাংশে নেমেছে।
জিইডির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সার্বিক মূল্যস্ফীতির বড় অংশ এখনো খাদ্য খাত থেকেই আসছে। জানুয়ারিতে মোট মূল্যস্ফীতির প্রায় ৪৩ শতাংশ অবদান ছিল খাদ্য খাতের। আগের মাসে এই হার ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। আবাসন ও ইউটিলিটি খাতের অবদান প্রায় ১৫ শতাংশ এবং বিবিধ পণ্য ও সেবার অবদান ছিল ৯ শতাংশের কিছু বেশি।
তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতির ভেতরের কাঠামোয় কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে। চালের মূল্যবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় এ খাতের অবদান কমেছে। ডিসেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান ছিল ৩৭ শতাংশের বেশি, যা জানুয়ারিতে কমে প্রায় ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে চালের মূল্যস্ফীতি ১১.৯২ শতাংশ থেকে কমে ৭.৬১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু চালের দামে এই স্বস্তি সামগ্রিক পরিস্থিতিকে খুব বেশি বদলাতে পারেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবজি, ফল ও মাছের দাম বাড়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়েই রয়ে গেছে। বিশেষ করে মাছ ও শুকনা মাছ খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে বড় অবদান রাখছে। সবজির দাম বাড়ার পেছনে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং পাইকারি ও মধ্যস্বত্বভোগী পর্যায়ে অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতাকে দায়ী করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ আরও বাড়ছে। জানুয়ারিতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.০৮ শতাংশ, যা ডিসেম্বরে ছিল ৮.০৭ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। জিইডির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় ও আয়ের ব্যবধান ধীরে ধীরে বাড়ছে।
এদিকে রাজস্ব আদায়েও প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। জানুয়ারিতে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫২ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা। কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আদায় করতে পেরেছে ৩৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। এতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৫১২ কোটি টাকা। আমদানি-রপ্তানি শুল্ক, অভ্যন্তরীণ ভ্যাট এবং আয়কর—সব প্রধান খাতেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম আদায় হয়েছে।
যদিও ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে রাজস্ব আদায় কিছুটা বেড়েছে, তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.৮১ শতাংশ। অর্থাৎ রাজস্ব আহরণের গতি এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও উদ্বেগের ইঙ্গিত দিয়েছে জিইডির প্রতিবেদন। চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের গতি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। প্রকল্প প্রস্তুতিতে দুর্বলতা, ক্রয়প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, জমিসংক্রান্ত জটিলতা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

