অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত মিলেছিল। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক হয়নি। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও রাজস্ব আহরণে ঘাটতি এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক, ফেব্রুয়ারি ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখাকে কঠিন করে তুলতে পারে।
জিইডি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ৮ শতাংশের ঘরে। মূলত চালের দাম কমে আসার কারণেই এই স্বস্তি এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মূল্যস্ফীতিতে এখনো সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখছে খাদ্যপণ্য। জানুয়ারিতে মোট মূল্যস্ফীতির ৪৩ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ এসেছে খাদ্য খাত থেকে, যা ডিসেম্বরে ছিল ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে আবাসন ও ইউটিলিটি খাতের অবদান ১৫ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ এবং বিবিধ পণ্য ও সেবা খাতের অবদান ৯ দশমিক ৩১ শতাংশ। কিছু অখাদ্য পণ্যের দাম বাড়লেও ভোক্তা মূল্যসূচকে তাদের ওজন কম হওয়ায় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে এর প্রভাব সীমিত ছিল।
চালের দামের চাপ কমে আসায় খাদ্য মূল্যস্ফীতিতেও কিছুটা স্বস্তি এসেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান ডিসেম্বরে ৩৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ থাকলেও জানুয়ারিতে তা কমে ২২ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে চালের মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ৬১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মাঝারি, মোটা ও সরু—সব ধরনের চালেই মূল্যবৃদ্ধির হার কমেছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট মূল্যস্ফীতির প্রায় ৪৩ শতাংশই খাদ্যপণ্য থেকে এসেছে। এর পরেই রয়েছে বাসস্থান ও ইউটিলিটি এবং অন্যান্য সেবা খাত। অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে পরিবারের ব্যয়ই এখনো মূল্যস্ফীতির প্রধান চালিকাশক্তি। তবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও মানুষের প্রকৃত আয়ের ওপর চাপ পুরোপুরি কমেনি। কারণ মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না।
দেশীয় নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বৈদেশিক খাত তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানিয়েছে জিইডি। জানুয়ারিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে প্রবাসী আয় এসেছে ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার, যদিও কয়েক মাস ধরে এ প্রবাহ প্রায় একই অবস্থায় রয়েছে।
অন্যদিকে রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব সংগ্রহ করেছে ৩৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। কিন্তু সংশোধিত মাসিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫২ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ভ্যাটসহ অন্যান্য কর খাতেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ধীরগতি দেখা গেছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মোট বরাদ্দের মাত্র ২১ দশমিক ১৮ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। প্রকল্প প্রস্তুতিতে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জিইডি।
তবে রফতানি খাতে কিছু ইতিবাচক প্রবণতাও দেখা গেছে। জানুয়ারিতে তৈরি পোশাক খাতে রফতানি হয়েছে ৩৬১ কোটি ডলারের পণ্য, যা ডিসেম্বরে ছিল ৩২৩ কোটি ডলার। একই সময়ে অ-আরএমজি রফতানিও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৯ কোটি ৮৯ লাখ ডলার।
তবে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কম থাকায় বোঝা যাচ্ছে, সামগ্রিক আমদানি বাড়লেও বেসরকারি বিনিয়োগ এখনো দুর্বল রয়েছে।
জিইডির মতে, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি গ্রহণ জরুরি। কিছু ক্ষেত্রে চাপ কমার লক্ষণ দেখা গেলেও ভারসাম্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে শক্তিশালী নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।
নতুন সরকারের জন্য অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিবেদনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এডিপি বাস্তবায়ন জোরদার করা, ঋণের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
এছাড়া সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে সরকারের পরিকল্পিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালুর বিষয়টিকেও সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর বাইরে মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে জিইডি। সংস্থাটির সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত হলে জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপরও পড়তে পারে। তাই সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

