হাজারো মাইল দূরের এক যুদ্ধের প্রভাব ধীরে ধীরে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় দেশে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি ও গ্যাস ব্যবহারে সীমিত রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে এবং বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি ও পরিশোধিত তেল সংগ্রহের চেষ্টা জোরদার করেছে।
এর প্রভাব মাঠপর্যায়েও দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে উদ্বিগ্ন গ্রাহকদের ভিড় বাড়ছে। অনেকেই আগাম জ্বালানি মজুতের চেষ্টা করছেন। গ্যাসের ঘাটতির কারণে কয়েকটি সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। একই সময়ে জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি আনার পথ খুঁজছেন।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানান, মার্চ মাসে দেশে কয়েকটি এলএনজি কার্গো আসার কথা ছিল। এর মধ্যে দুটি কার্গো নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সেই ঘাটতি পূরণে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহের জন্য ইতোমধ্যে বুকিং দেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্ধারিত সময়ে এসব কার্গো দেশে পৌঁছালে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা হবে না। তবে নির্ধারিত সময়ে কার্গো না পৌঁছালে সার উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস ব্যবহারে রেশনিং করা হতে পারে।
বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। এর বড় অংশই হরমুজ প্রণালি হয়ে দেশে আসে। ফলে আগামী সপ্তাহগুলোতে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি চালান সময়মতো পৌঁছাবে কি না—তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই সেচ মৌসুমে জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে। শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ আগেই অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।
সামনে ঈদকে কেন্দ্র করে মূল্যস্ফীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও শঙ্কা বাড়ছে। দীর্ঘদিন সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে, শিল্প উৎপাদন ধীর হতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি বরাদ্দ ১০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সরবরাহ দৈনিক ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমানো হচ্ছে। সিলেটের শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি ছাড়া অন্য সব সার কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মজুতদারি ও চোরাচালান ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে ভিজিল্যান্স টিম গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে পেট্রোল পাম্পগুলোকে ড্রাম বা কনটেইনারে জ্বালানি বিক্রি বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
সরকারি হিসাবে বর্তমানে ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায় ৯ দিনের জন্য। অকটেনের মজুত ১৫ দিন এবং ফার্নেস অয়েলের মজুত ৬০ দিনের মতো। কয়েক সপ্তাহ আগেও ফার্নেস অয়েলের মজুত ছিল প্রায় ৯৩ দিনের। বিপিসির পরিচালক (অপারেশন্স ও পরিকল্পনা) এ কে এম আজাদুর রহমান বলেন, যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকার-টু-সরকার চুক্তি রয়েছে, সেসব দেশের অতিরিক্ত কার্গো থেকে কিছু জ্বালানি আনার চেষ্টা চলছে।
এ ছাড়া জরুরি আমদানির জন্য সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন ও আফ্রিকার সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সৌদি আরবের আরামকোও প্রয়োজন হলে অন্য উৎস থেকে পরিশোধিত তেল সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছে।
পাম্প মালিকদের সঙ্গে আলোচনা
বিপিসি সম্প্রতি পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছে। সেখানে পাম্পগুলোকে ড্রাম বা কনটেইনারে তেল বিক্রি বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের স্বাভাবিক প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সমিতির সভাপতি সাজ্জাদ করিম কাবুল বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় জ্বালানি বিক্রি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে বিপিসি নির্দেশনা দিয়েছে। তবে পাম্প মালিকদের পক্ষে সরাসরি কোনো গ্রাহককে তেল না দেওয়া কঠিন। এজন্য সরকারকে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে প্রচারের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ কত পরিমাণ জ্বালানি নিতে পারবেন—সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধও করেছেন পাম্প মালিকরা।
তিনি সতর্ক করেন, সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে অনেক পাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এদিকে রাজধানীর কয়েকটি পাম্পে ইতোমধ্যে জ্বালানি সংকট দেখা গেছে। কয়েকটি পাম্পে জরিপে দেখা যায়, কিছু পাম্পে জ্বালানি নেই এবং কোথাও কোথাও গ্রাহকপ্রতি মাত্র ৫০০ টাকার জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে। গাবতলী এলাকায় কয়েকটি পাম্পে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। এক মোটরসাইকেল চালক জানান, তেল নিতে তাকে প্রায় এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে।
সরকার স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির জন্য ২৩টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মাস্টার সেল অ্যান্ড পারচেজ চুক্তি করেছে। মার্চ মাসে মোট সাতটি এলএনজি কার্গো আনার পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে কাতার থেকে ছয়টি এবং অ্যাঙ্গোলা থেকে একটি কার্গো আসার কথা ছিল।
তবে কাতার জানিয়েছে, নির্ধারিত দুটি কার্গো সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। সেই ঘাটতি পূরণে স্পট মার্কেট থেকে সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানি গানভোর ও ভিটোল এশিয়ার মাধ্যমে এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেন, এপ্রিল মাসে হরমুজ প্রণালি হয়ে আরও পাঁচটি এলএনজি কার্গো আসার কথা রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে সেগুলো সময়মতো পৌঁছাবে বলে সরবরাহকারীরা আশ্বাস দিয়েছেন। তবে পরিস্থিতি জটিল হলে অস্ট্রেলিয়া, অ্যাঙ্গোলা, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি সংগ্রহের বিকল্প ব্যবস্থাও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার জনগণকে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ কমানো, ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার এবং কারপুলিং ব্যবস্থার আহ্বান জানিয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি সাশ্রয়ী ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে। রান্না ও অন্যান্য কাজে গ্যাস ব্যবহারে সাশ্রয়ী পদ্ধতি অনুসরণ, গ্যাসচালিত যন্ত্রপাতির অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার বন্ধ এবং পাইপলাইনে লিকেজ রোধে নিয়মিত পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি দপ্তর ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অফিস চলাকালীন এবং অফিস শেষে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার কার্যালয়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছেন। সেখানে কক্ষের অর্ধেক বাতি বন্ধ রাখা হয়েছে এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সেট করা হয়েছে।
জ্বালানি খাতের বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ইতোমধ্যে এলএনজির দাম প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। এলপিজির দামও ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
তার মতে, বিশ্ববাজারে মজুত কমে যাওয়ায় দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ জ্বালানি উপসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে পরিবহন করা হয়। হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের অবরোধ তৈরি হলে সরবরাহ ও মূল্য—দুটোর ওপরই বড় চাপ পড়তে পারে।
তিনি বলেন, উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল এশিয়ার দেশগুলো বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে গেলে জ্বালানি সংগ্রহ কঠিন হয়ে উঠবে। তবে তার ধারণা, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকবে না এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো সমাধান বের হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বা রপ্তানিতে পড়ার সম্ভাবনা কম। তবে দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং রপ্তানি কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
তিনি বলেন, সরকার যদি বাড়তি দামে তেল ও গ্যাস আমদানি করে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চায়, তাহলে শিল্প খাতের ওপর অতিরিক্ত মূল্য চাপানো ঠিক হবে না। এ কারণে জ্বালানি আমদানির ওপর বিদ্যমান শুল্ক, কর ও ভ্যাট পুরোপুরি প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেন তিনি।

