চলতি অর্থবছরে গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে বরাদ্দের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ অত্যন্ত কম হওয়ায় দেশের গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্কের নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগে চিঠি দিয়েছে এলজিইডি।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, দেশের পাকা সড়ক নেটওয়ার্কের প্রায় এক লাখ ৩২ হাজার কিলোমিটার সড়কে নিয়মিত, সময়ান্তর এবং পুনর্বাসনমূলক রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। কিন্তু চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে মাত্র তিন হাজার কোটি টাকা, যা মোট চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক বন্যা, দীর্ঘমেয়াদি অতিবৃষ্টি এবং আগের বছরের অসমাপ্ত কাজ যোগ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
চলতি অর্থবছরের অনুন্নয়ন বাজেটে এলজিইডির ‘মেরামত ও সংরক্ষণ’ মঞ্জুরি খাতের আওতায় ‘গ্রামীণ সড়ক’ উপখাতে অতিরিক্ত ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দের অনুরোধ জানানো হয়েছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. বেলাল হোসেন এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগে চিঠি পাঠান। চিঠির অনুলিপি অর্থ সচিবের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে এলজিইডির সহকারী প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মাদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, চাহিদা অনেক বেশি হলেও বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে খুব কম। সীমিত অর্থ দিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই অন্তত ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে অতিরিক্ত ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দের আবেদন করা হয়েছে।
এলজিইডির তথ্যমতে, সংস্থার অধীনে বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় চার লাখ ১১ হাজার কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় এক লাখ ৬৭ হাজার ৪০০ কিলোমিটার পাকা সড়ক। প্রতিবছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের মাধ্যমে গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার নতুন পাকা সড়ক নেটওয়ার্কে যুক্ত হচ্ছে। ফলে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের পরিধি এবং চাপ দুইই বাড়ছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, পাকা সড়ক নেটওয়ার্কের মধ্যে প্রায় এক লাখ ৩২ হাজার কিলোমিটার সড়ক নিয়মিত, সময়ান্তর এবং পুনর্বাসন রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। এ কাজের জন্য মোট ২১ হাজার কোটি টাকা চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু চলতি অর্থবছরে ‘গ্রামীণ সড়ক’ উপখাতে বরাদ্দ রয়েছে মাত্র তিন হাজার কোটি টাকা। এই বরাদ্দ দিয়ে গ্রামীণ সড়ক সংস্কার কার্যক্রম কার্যকরভাবে চালিয়ে যাওয়া বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছে এলজিইডি।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে আকস্মিক বন্যায় দেশের ১১টি জেলা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব জেলা হলো ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজার। বন্যায় এসব এলাকার সড়ক ও অবকাঠামো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। তবে পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত টানা সাত মাস অতিবৃষ্টির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সড়কের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এলজিইডি জানিয়েছে, এত দীর্ঘ সময় ধরে অতিবৃষ্টির কারণে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা আগে খুব একটা দেখা যায়নি। অনেক জায়গায় দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকার ফলে সড়কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং পিচ উঠে গেছে। এতে বহু সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
এলজিইডি বলছে, পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় প্রতিবছরই রক্ষণাবেক্ষণের কিছু কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। নতুন সড়ক যুক্ত হওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণের পরিধি বাড়ছে, কিন্তু বরাদ্দ সেই অনুপাতে বাড়ছে না। পাশাপাশি ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশে নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে বিশেষ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়েছে। এতে জরুরি খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে, যা বিদ্যমান বরাদ্দের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এলজিইডি মনে করছে, গ্রামীণ সড়কের ন্যূনতম রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে এবং চলমান ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় চলতি অর্থবছরের অনুন্নয়ন বাজেটের আওতায় ‘গ্রামীণ সড়ক’ উপখাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ অত্যন্ত প্রয়োজন।

