মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে বিনিয়োগকারীদের আচরণে আবারও সতর্কতা দেখা দিয়েছে। অনিশ্চয়তার সময় নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝোঁক বাড়ে—এমন বাস্তবতায় আবারও আলোচনায় এসেছে একটি পুরোনো প্রশ্ন। সংকটের মুহূর্তে ডলার, সরকারি বন্ড নাকি সোনা—কোন সম্পদটি সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হতে পারে? তবে বাজারের সাম্প্রতিক প্রবণতা বলছে, আগের মতো সহজভাবে এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাচ্ছে না।
ডলারের দিকে ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা:
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহে নিরাপদ সম্পদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে মার্কিন ডলার। ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের শক্তি পরিমাপ করা হয় যে ডলার সূচকের মাধ্যমে, তা প্রায় ১.৫ শতাংশ বেড়েছে। বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে সাধারণত সুইস ফ্রাঁ ও জাপানি ইয়েন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। সাম্প্রতিক সময়ে এই দুই মুদ্রার বিপরীতেও ডলার শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে।
গত বছর শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নামার সময় ডলার দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সে সময় অনেক বিনিয়োগকারী প্রশ্ন তুলেছিলেন—ডলার কি এখনও নিরাপদ আশ্রয়ের ভূমিকা রাখতে পারে? কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আবারও ডলারের চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি নগদ ডলারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখন বড় জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ। ফলে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তা ডলারের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তারা এটিও সতর্ক করে বলেছেন, নীতিগত অনিশ্চয়তা বাড়লে ডলারের নিরাপদ আশ্রয়ের মর্যাদা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকিও থাকে।
ভূরাজনৈতিক সংকটের সময় সাধারণত সরকারি বন্ডকে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বন্ড বাজারে সেই চিত্র স্পষ্ট নয়। বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা বন্ড কেনাবেচার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন মূলত সম্ভাব্য মুদ্রাস্ফীতির হিসাব কষে, নিরাপদ আশ্রয়ের কারণে নয়।
এ সপ্তাহেই জার্মানির ১০ বছরের সরকারি বন্ডের সুদহার প্রায় ১৪ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেয়। অনেক দেশের বাড়তি ঋণগ্রহণ এবং বাড়তে থাকা বাজেট ঘাটতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে ঐতিহ্যগতভাবে যে নিরাপত্তার অনুভূতি বন্ড বাজারে দেখা যায়, তা এখন তুলনামূলক দুর্বল।
অন্যদিকে সংকটের সময় নির্ভরযোগ্য সম্পদ হিসেবে সোনার অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই শক্ত। চলতি দশকে স্বর্ণের দাম প্রায় ২৪০ শতাংশ বেড়েছে। যদিও এ সপ্তাহে সোনার দামে কিছুটা ওঠানামা দেখা গেছে, বিশ্লেষকেরা এটিকে সাময়িক বলে মনে করছেন।
বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ভালো পারফর্ম করা সম্পদ বিক্রি করেন। এতে কখনো কখনো সোনার দাম সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে। তবে মুদ্রাস্ফীতি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশ্বজুড়ে ঋণের উচ্চমাত্রা—এই তিনটি কারণ সোনার দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ অবস্থানকে এখনও শক্ত রাখছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বড় বড় বিনিয়োগ তহবিলেও এখনো সোনার অংশ তুলনামূলক কম। কিছু বিশ্লেষকের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চলতি বছর স্বর্ণের দাম ৬ হাজার ডলারের কাছাকাছি পৌঁছানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
নিরাপদ মুদ্রা হিসেবে জাপানি ইয়েন ও সুইস ফ্রাঁ দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতিতে এই দুই মুদ্রাও প্রত্যাশামতো শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। চলতি সপ্তাহে জাপানি ইয়েন প্রায় ০.৮ শতাংশ এবং সুইস ফ্রাঁ প্রায় ১.২ শতাংশ দুর্বল হয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এর পেছনে কয়েকটি নির্দিষ্ট কারণ কাজ করছে। জাপানে সুদের হার বাড়ানো নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা রয়েছে। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে—এমন আশঙ্কাও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে। এই দুই কারণই মুদ্রাগুলোর ওপর চাপ তৈরি করেছে।
সাধারণত সংকটের সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি বা নিত্যপণ্যের মতো প্রতিরক্ষামূলক খাতের শেয়ার তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকে। কিন্তু এবার সেই চিত্রও স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে এই খাতগুলোর সূচকও সাম্প্রতিক সময়ে কমেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিনিয়োগকারীরা অবকাঠামো ও শিল্প খাতের মতো বাস্তব সম্পদে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এর ফলে বাজারের স্বাভাবিক ধারা কিছুটা বদলে গেছে এবং প্রচলিত নিরাপদ খাতগুলো আগের মতো সুবিধা পাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, সংকটের সময় কোনো একক সম্পদকে পুরোপুরি নিরাপদ বলা কঠিন। ডলার, স্বর্ণ কিংবা সরকারি বন্ড—প্রতিটি সম্পদেরই নিজস্ব শক্তি ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও বাজারের প্রবণতা অনুযায়ী তাদের আচরণও পরিবর্তিত হতে পারে।

