বেসরকারি বাস মালিক সমিতি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদি বাস ইজারা দেওয়ার কারণে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) সমস্যায় পড়েছে। সিঙ্গেল ও ডাবল ডেকার বাসগুলোর ইজারা থেকে সংস্থাটি এখনও ৩ কোটি ৩৩ লাখ ৮৫ হাজার ৫৬৯ টাকা আদায় করতে পারেনি।
বিআরটিসির কর্মকর্তাদের মতে, ৫ থেকে ১০ বছরের লিজে অনেক বাস ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ফলে মূল ডিপোগুলোতে বাসের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ২০১০-১১ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চীনের নরডিক ডেভেলপমেন্ট ফান্ড, দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন ফান্ড ও ইন্ডিয়ান ডলার ক্রেডিট লাইনের মাধ্যমে ১ হাজার ৫৫৮টি বাস কেনা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩০৮টি এখনো কার্যকর। তবে এর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে লিজ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ আছে, অনেক বেসরকারি মালিক লিজে নেওয়া বাস নিজের সুবিধামতো চালান বা লিজের টাকা পরিশোধ না করেও বাসগুলো ধরে রাখেন। অনেক সময় বাসের যত্ন নেওয়া হয় না, ফলে লিজ শেষ হলে বাসগুলো ‘স্ক্র্যাপ’ হিসেবে ফেরত আসে। এছাড়া ভারতের ঋণে কেনা আর্টিকুলেটেড ও ভলভো বাসগুলোও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে ডিপোগুলোতে পড়ে থাকে।
লিজের কারণে সাধারণ যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত রুটে বাসের সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও দূরপাল্লার রুটে বিআরটিসির ট্রিপ সংখ্যা কমেছে। দীর্ঘমেয়াদি লিজে বাসের কার্যকারিতা ১৫–২০ বছরের পরিবর্তে ৭–৮ বছরেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। যারা দীর্ঘমেয়াদি বাস ইজারা নিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা রুজু করা হলেও কোনো আদালতের নির্দেশনা মেলেনি। ফৌজদারি মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত থাকা সত্ত্বেও বিআরটিসির কর্মকর্তারা তা কার্যকর করেননি।
বিআরটিসির এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বর্তমান প্রশাসন বাস লিজসংক্রান্ত ইস্যুতে সক্রিয় হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি লিজ চুক্তিতে অসংগতি থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পূর্বতন প্রশাসন মামলা দায়েরে ঢিলেমি দেখালেও নতুন প্রশাসন ফৌজদারি মামলা করবে।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, “বিআরটিসি স্বল্প মেয়াদে হয়তো লভ্যাংশ পাচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি লিজে বিদেশি ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ওপর ঋণের বোঝা বাড়ায়।”
রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বিআরটিসি ২০২১ সাল থেকে নিজস্ব আয় থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা দিতে চাইছে। ২৪টি বাস ডিপো ও ২টি ট্রাক ডিপোকে লাভজনক করার চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ লাখ ৪৬ হাজার ৬১৭ টাকা অজমা রয়েছে। বিআরটিসি অবসরপ্রাপ্ত বা চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও বকেয়া আদায় করা হবে। মাসিক বেতন থেকে কিস্তি কেটে অর্থ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাজধানী ও জেলা শহরের বাসগুলো ‘স্টাফ বাস’ হিসেবে চলছে, যা লাভজনক নয়। ৩৩০টি এসি বাসের মধ্যে ৭৮টি নষ্ট, বাকি ২৫২টি নিয়মিত চলাচল করছে না। লসে চলাচলের কারণ জানতে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ডিপোগুলোর কার্যকারিতা ব্যতীত, গত ডিসেম্বরে ২৬টি ডিপোর মধ্যে মাত্র ৪টি ডিপো ছাড়া বাকিরা টার্গেট ট্রিপ পূরণ করতে পারেনি। সচল বাসের ১০–১৫ শতাংশ বিনা কারণে বসিয়ে রাখা হচ্ছে। ২০টি ডিপো বরাদ্দের চেয়ে বেশি ব্যয় করেছে। জ্বালানি খরচ নিয়ন্ত্রণে বগুড়া, দিনাজপুর, সিলেট, রংপুর ও চট্টগ্রাম ডিপো নির্ধারিত সীমার বাইরে খরচ করেছে।
ড. হাদিউজ্জামান আরও বলেন, “রাজস্ব ঘাটতি মূলত কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত দুর্বলতার কারণে। কিট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার ব্যবহার করলে প্রতিটি ডিপোর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা সহজ হয়ে যাবে এবং চাপও কমে যাবে।”

