বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংক–এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চিত্র, যা শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং একটি কাঠামোগত সমস্যারও ইঙ্গিত দেয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৪৫ শতাংশই ১০ কোটি টাকার নিচের ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কাছে গেছে। তুলনামূলকভাবে উচ্চ সুদের হার থাকা সত্ত্বেও এই ঋণের খেলাপি হার সীমিত—প্রায় ২৫ শতাংশের মধ্যে।
অন্যদিকে, বড় ঋণ—বিশেষত ৫০ কোটি টাকার বেশি—খেলাপির হার ভয়াবহ, ৫১ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। অর্থাৎ যত বড় ঋণ, খেলাপির ঝুঁকিও তত বড়। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেখাচ্ছে যে দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তি এখনও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের ঋণ বিতরণ নীতিতে বড় করপোরেট গ্রাহকদের প্রতি অযৌক্তিক ঝোঁক রয়েছে, যা ঝুঁকির ঘনত্ব বাড়াচ্ছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যার ৩৬.৩ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে এক কোটি টাকার নিচের ঋণে খেলাপি হার মাত্র ১৫.২ শতাংশ, ১ থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণে গড় খেলাপি হার ২১.৫৫ শতাংশ। কিন্তু ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণে তা ৪৮ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণে ৫১ শতাংশে পৌঁছেছে। এই বৈপরীত্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার নীতিগত দুর্বলতা ও বাস্তব অর্থনৈতিক আচরণের প্রতিফলন।
ছোট উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। তাদের জন্য ঋণ শুধু টাকা নয়, বেঁচে থাকার মাধ্যম। তাই তারা ঋণ পরিশোধে তুলনামূলক বেশি আন্তরিক। বড় গ্রাহকদের ক্ষেত্রে চিত্র উল্টো; রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ প্রায়শই ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতাকে দুর্বল করে। অনেক বড় ঋণগ্রহীতা ঋণ ব্যবসার উন্নয়নে ব্যবহার না করে সম্পদ সঞ্চয়, বিদেশে অর্থ পাঠানো বা অন্য খাতে স্থানান্তর করেন। ফলে ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে জমতে থাকে শ্রেণীকৃত ঋণের পাহাড়।
শ্রেণীকৃত ঋণের এই ভয়াবহ অবস্থার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে। প্রথমত, বড় ব্যবসাগুলো এখনও সুশৃঙ্খল করপোরেট কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয় না। আর্থিক রিপোর্টিং, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর হিসাব ব্যবস্থাপনায় বড় ঘাটতি আছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়, যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণের পর তার যথাযথ ব্যবহার পর্যবেক্ষণে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। অনুমোদিত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটি মনিটর করার প্রক্রিয়া প্রায় অনুপস্থিত।
বাংলাদেশের ব্যবসা সংস্কৃতির আরেকটি দুর্বলতা হলো প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার অভাব। অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা সম্প্রসারণের আগে মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তি সংযোজন বা অটোমেশন বিবেচনা করেন না। ফলে ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার না করে অপ্রয়োজনীয় স্থাবর সম্পদ বা অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয়। এতে ব্যবসার আর্থিক স্বাস্থ্য দুর্বল হয় এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যায়।
অন্যদিকে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ছোট পরিসরে হলেও বাস্তব অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। উৎপাদন, বিতরণ, সেবা প্রদান—এসবের মাধ্যমে তারা স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তারে তাদের অবদান অপরিসীম। কিন্তু ব্যাংকিং নীতিতে তাদের জন্য কাঠামোগত সহায়তা সীমিত। উচ্চ সুদের হার এবং কঠোর জামানত শর্ত প্রায়ই তাদের প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব হল ঋণ বিতরণের দর্শন পুনর্বিবেচনা করা। বড় ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকির ঘনত্ব বাড়ায়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ-কেন্দ্রিক ঋণ কৌশল গ্রহণ করলে ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। ছোট ঋণের সংখ্যা বেশি হলেও ঝুঁকি কম থাকায় সামগ্রিক পোর্টফোলিও স্থিতিশীল থাকে। ব্যাংক যদি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ গ্রাহকদের জন্য আর্থিক পরামর্শ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করে, ঋণের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
ব্যাংকের ভূমিকাও পরিবর্তন প্রয়োজন। কেবল ঋণদাতা নয়, ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে। ঋণ বিতরণের পর নিয়মিত মনিটরিং, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সহায়তা এবং কর্মী প্রশিক্ষণে উৎসাহ দেওয়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ খাতকে শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদেরও বুঝতে হবে, আধুনিক ব্যবসা কেবল পুঁজি দিয়ে টিকে থাকে না; প্রয়োজন সুশাসন, প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ।
বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ টেকসই করতে হলে ব্যাংকিং খাতকে বড় ঋণের মোহ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ-কেন্দ্রিক ঋণ নীতি শুধু খেলাপি কমাবে না, অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করবে। কারণ দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক শক্তি বড় করপোরেট ভবনে নয়, বরং হাজারো ছোট উদ্যোক্তার পরিশ্রমে লুকিয়ে আছে। ব্যাংকগুলো যদি এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ-কে অগ্রাধিকার দেয়, তবে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবেই বাংলাদেশ ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে এগোতে পারবে।
সাইফুল হোসেন: লেখক, ফাইন্যান্স অ্যান্ড বিজনেস মেন্টর

