ছোট মূলধনী তথ্য প্রযুক্তি খাতের কোম্পানি ইনটেক লিমিটেড দীর্ঘ বছর ধরে আর্থিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। শেষ পাঁচটি অর্থবছরের মধ্যে চারটি বছরে লোকসান করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সম্পদের তুলনায় দায়ও বেশি। এমন দুর্বল আর্থিক ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও সম্প্রতি কোম্পানিটির শেয়ারদরে হঠাৎ হু হু করে উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ঘটনা ঘটে। ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার নিয়োগের দুই দিন আগে থেকেই ইনটেক লিমিটেডের শেয়ারদর বাড়তে শুরু করে। গভর্নরের নিয়োগের পরদিন শেয়ারদর সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ সীমা, প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত ওঠে। ২২ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি মাত্র চার কার্যদিবসে শেয়ারদর ২৯ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৩৭ টাকা ৪০ পয়সায় বৃদ্ধি পায়—প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়ে।
এই অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির পেছনে বাজারে ছড়ানো গুজবকে দায়ী করা হচ্ছে। শোনা যায়, কোম্পানিটি নবনির্বাচিত গভর্নরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এবং তার বড় অংশের মালিকানা রয়েছে। এমন গুজব ছড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। এতে ক্রেতার চাপ বেড়ে যায়, বিক্রেতার তুলনায়, এবং শেয়ারদর হঠাৎ উর্ধ্বগামী হয়।
বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। গভর্নরের হাতে কোম্পানির শেয়ার মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ। বিএসইসির শেয়ার বিক্রি সংক্রান্ত আইনের জটিলতার কারণে এই স্বল্প অংশও বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। আইন অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিত শেয়ার ধারণ কমপক্ষে ৩০ শতাংশ হতে হবে। ইনটেকের বর্তমান উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধরে রেখেছেন। অন্য উদ্যোক্তারা নতুন শেয়ার কিনতে আগ্রহী নন, তাই গভর্নরের শেয়ার বিক্রি হয়নি।
আরেকটি গুজব হলো, ইনটেক লিমিটেডে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদে নেতৃত্ব দিচ্ছে চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ এবং গভর্নরের সঙ্গে তাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ সুবিধা পেতে পারে। এ ধরনের গুজব শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কোম্পানির শেয়ারকে আকর্ষণীয় করে তোলে। বাস্তবে, গভর্নর ইতিমধ্যেই তার শেয়ার বিক্রি করেছেন এবং এস আলম গ্রুপ শেয়ারবাজার থেকে কিনে নিয়েছেন। গভর্নরের বর্তমান কোম্পানিতে কোনো ভূমিকা নেই।
এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠার সময় এস আলম গ্রুপের শেয়ার ছিল না। পরবর্তী সময়ে তারা শেয়ারবাজার থেকে শেয়ার কিনে নিয়ন্ত্রণে আসেন। ২০০২ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া সময় গভর্নরের শেয়ার ছিল ৬৬.৩৩ শতাংশ। বর্তমানে তা শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ। দীর্ঘদিন তিনি পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন না।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, “গভর্নরের ওই প্রতিষ্ঠানে শেয়ার আছে কিনা, সেটাও তিনি মনে করতে পারছেন না। দীর্ঘ বছর কোনো যোগাযোগও হয়নি। কিছু গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিষয়টি ছড়িয়ে দিয়েছে। গভর্নরকে বিতর্কিত করার এই প্রচেষ্টা অত্যন্ত অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক।” ২০০২ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় এটি বছরে কয়েক কোটি টাকার ব্যবসা করত। এখন কোটি টাকার ব্যবসাও করতে হিমশিম খেতে হয়।
২০২০-২১ অর্থবছরে কোম্পানির পরিচালন আয় মাত্র ২৩ লাখ টাকা। সব ব্যয়সহ ওই বছরে নিট লোকসান হয়েছে ৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা। পরের বছর ৫৮ লাখ টাকার আয় করেও ৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এরপর সামান্য ১ কোটি টাকার আয়ের পরও ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কোম্পানিটি ৫০ লাখ টাকার মুনাফা করলেও, সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা।
ধারাবাহিক লোকসানের ফলে ৩১ কোটি ৩২ লাখ টাকার পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানির পুঞ্জীভূত লোকসান এখন ৩২ কোটি ৭২ লাখ টাকা। শেয়ার মূলধন থেকে এই লোকসান বাদ দিলে ইনটেক লিমিটেডের সম্পদ বর্তমানে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার ঋণাত্মক অবস্থায়। অর্থাৎ কোম্পানি কোনো কারণে বন্ধ বা অবসায়নের পথে গেলে বিনিয়োগকারীরা কিছুই পাবেন না, বরং কোম্পানির দায় বাড়বে।
নিরীক্ষক মাহমুদ সবুজ অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসও উল্লেখ করেছেন, এই দুর্বল আর্থিক ভিত্তিতে কোম্পানির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চালানো কতটুকু সম্ভব, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। তবুও সম্প্রতি কোম্পানিটির শেয়ারদরে হঠাৎ উল্লম্ফন ঘটেছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এত দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কোম্পানিতে বিনিয়োগের ঝুঁকি উচ্চ। সম্পদের চেয়ে দায় বেশি এমন কোম্পানিতে দ্রুত মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
শেয়ারদরের হঠাৎ বৃদ্ধির পেছনে গভর্নরের নাম ব্যবহার করে বাজারে কুচক্রী মহল স্বার্থসিদ্ধি করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইনটেক লিমিটেডে গভর্নরের কোনো সক্রিয় ভূমিকা নেই, আর কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ জায়েদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের সব প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত সাড়া দেয়নি। ৪ মার্চ থেকে মোবাইলে একাধিকবার ফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

