২০২৪ সালের ২৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের মেমফিসে ৪১ হাজার ফুট উচ্চতায় স্কাইডাইভ করেছিলেন চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। বাংলাদেশের পতাকা হাতে নিয়ে এই দুঃসাহসী লাফটি তাঁর নাম গিনেস বুকে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হয় ২০২৩ সালের ১ জুলাই।
কিছু মাসের মধ্যেই, ১২ সেপ্টেম্বর চৌধুরী আশিক বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর আশিক নতুন দায়িত্ব নেয়ার পর একের পর এক বিনিয়োগ প্রচারমূলক কর্মকাণ্ডে উদ্যোগী হন। ১৮ মাস আগে, যখন ড. ইউনূসের সরকার বিদেশ থেকে তাকে আনা হয়, তখন আশিককে ঘিরে তৈরি হয়েছিল এক অদ্ভুত রকমের ভক্তিবাদ। সোশ্যাল মিডিয়ায় তার ইংরেজি বলার ঢং, স্মার্ট চেহারা এবং আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপনা নিয়ে শুরু হয় ‘আশিক ম্যাজিক’-এর গল্প। তখন বলা হচ্ছিল, তিনি নাকি দেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ আনবেন।
কিন্তু দেড় বছর পার হওয়ার পর এই ম্যাজিকের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিডার চেয়ারম্যান দেশের স্বার্থে যতটা কাজ করেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় এবং প্রচেষ্টা তিনি ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত ইমেজ বৃদ্ধি এবং সামাজিক ব্যবসা সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে দিয়েছেন।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক মাহমুদ যেন গ্রামীণের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর মার্কেটিং ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বিদেশি বিনিয়োগের তথ্য দেখা মানেই হতাশা। নতুন বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৫৫ কোটি ডলার, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এমনকি করোনাকালের তুলনায়ও এই সংখ্যা কম। নিট এফডিআই বেড়েছে ১৬৯ কোটি ডলারে, তবে তার বড় অংশ এসেছে পূর্বের কোম্পানিগুলোর পুনর্বিনিয়োগ এবং ঋণ থেকে। নতুন বিনিয়োগকারীদের আগমন প্রায় শূন্যের মতো।
নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে ৫৮ শতাংশ। যেখানে করোনার সময় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছিল, সেখানে গত অর্থবছরে তা কমে হয়েছে মাত্র ৬৬ হাজার কোটি টাকার। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে নিবন্ধিত প্রকল্পের সংখ্যা নেমে এসেছে ৮১৪টিতে, আগের বছরের ১ হাজার ১১৩টির তুলনায়। এছাড়া, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ১৯ শতাংশ, যা বিদেশি বিনিয়োগের ঘাটতি আরও স্পষ্ট করছে।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ছয় মাস ধরে ৭ শতাংশের নিচে পড়ে আছে, যেখানে আগে ছিল ১০ শতাংশের বেশি। গত বছরের এপ্রিলে ধুমধাম নিয়ে অনুষ্ঠিত বিনিয়োগ সম্মেলনে ৫০টি দেশের চার শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নিয়েছিলেন। সেই সময়ে ঘোষণা হয়েছিল প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব। সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে গিয়েছিল প্রশংসায়। কিন্তু সেই ঘোষিত বিনিয়োগ এখন কোথায়? দেশের যেকোনো বড় উদ্যোক্তা একাই তিন-চার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন, কিন্তু তাদের যথাযথভাবে আহ্বানও জানানো হয়নি। যে “গর্জন” তৎকালীন সময়ে হয়েছিল, তা বাস্তবে অর্থবহ হয়নি।
দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে আসল সমস্যা সমাধান হয়নি। ব্যাংক খাত ধসে গেছে, কিছু ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। ঋণের সুদের হার ১৫ শতাংশের বেশি, যেখানে ভিয়েতনাম বা ভারতে তা অনেক কম। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এখনও প্রকট, মানসম্মত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানামা ধীর, ডিজিটাইজেশন সীমিত। আইনশৃঙ্খলা নাজুক, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তীব্র, উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে হামলা-মামলা চলছে।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাই তাদের পুঁজি ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। তারা অপেক্ষা করছেন একটি নির্বাচিত সরকারের, যা বিনিয়োগের নিরাপত্তা দিতে পারবে। যেখানে স্থিতিশীলতা নেই, সেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কেন আসবেন? বিদেশি রাষ্ট্রদূতরাও বলছেন, নির্বাচিত সরকার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া বড় বিনিয়োগ আসা কঠিন।
তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ভারত পেয়েছে ২৭ বিলিয়ন ডলার, ইন্দোনেশিয়া ২১ বিলিয়ন, ভিয়েতনাম ২০ বিলিয়ন, আর বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র দেড় বিলিয়ন। এমনকি পাকিস্তানও বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে। দুই বছর আগে পাকিস্তান বাংলাদেশের পেছনে ছিল, এখন তারা এগিয়ে। এই তুলনা স্পষ্ট করে দেয়, আশিক চৌধুরীর ‘মিরাকল’-এর দাবি কতটা ফাঁপা।
বিডার পক্ষ বলছে, অতীতে অনেক ভুয়া বা অকার্যকর নিবন্ধন হতো। সেগুলো বন্ধ করায় সংখ্যা কমেছে। তবে এটি আসলে দায় এড়ানোর চেষ্টা মাত্র। প্রকৃত বিনিয়োগ না এলে নিবন্ধনের মান উন্নত করার কোনো অর্থ নেই। মানুষ চায় কাজ, চায় কর্মসংস্থান, চায় কারখানা চালু হোক। কিন্তু বাস্তবতা হলো শিল্প-কারখানা বন্ধ হচ্ছে, কর্মসংস্থান কমছে।
আশিক চৌধুরীর তৎপরতা মূলত বড় বড় অবকাঠামো চুক্তি এবং চট্টগ্রাম বন্দর লজিস্টিকস সংক্রান্ত চুক্তি ঘিরে। বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার বিতর্ক তাকে তাড়া করছে। দেশের সম্পদ যেভাবে হাতবদল হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিক্রির নীল নকশা বাস্তবায়নের জন্য। নীতিগত সংস্কার বা ব্যবসায়িক পরিবেশের প্রকৃত উন্নতির চেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে ‘হাই-ভ্যালু ডিল’ এবং চমকপ্রদ ঘোষণায়। প্রচারে গর্জন তীব্র, বাস্তবে বর্ষণ শূন্য।
বিশ্লেষক মাসরুর রিয়াজ বলেছেন, “আমলাদের বাইরে থেকে একজনকে আনা হয়েছিল সাহসী সংস্কারের আশায়। কিন্তু দেড় বছরে কোনো বড় কাঠামোগত সংস্কার হয়নি। উদ্যোগ ছিল, কর্মস্পৃহাও ছিল, কিন্তু তা পরবর্তী ধাপে নেওয়া হয়নি। এখন আশিক চৌধুরী নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তিত্ব। তার আনা বিনিয়োগ কোথায় গেল? তিন হাজার কোটি টাকার ঘোষণা বাস্তবায়ন হয়নি। দেশে কোনো নতুন কারখানা বা কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি, অথচ তার ‘বেলুন’ ভরে উঠেছে।”
অর্থনীতির অবস্থা নাজুক। বিনিয়োগ আসছে না, অর্থনীতি ধসে যাচ্ছে, মানুষের কষ্ট বাড়ছে। এর মধ্যে আশিক চৌধুরীর প্রচার তীব্র, বাস্তব ফলাফলে তা মিলছে না। এখন প্রশ্ন উঠছে: এতদিনে তিনি দেশ থেকে কত টাকা নিয়েছেন? ঘোষিত বিনিয়োগ কোথায়? কোন প্রকল্পে কত টাকা এসেছে, সেই স্বচ্ছ হিসাব কোথায়?
চৌধুরী আশিক মাহমুদের নেতৃত্বে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইনভেস্টমেন্ট সামিট আয়োজন, স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা পেতে ইলোন মাস্কের স্টারলিংকের নিবন্ধন, নাসার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ বেসামরিক মহাকাশ অনুসন্ধানে চুক্তি, এবং সব বিনিয়োগ প্রচার সংস্থাকে একই ছাদের নিচে আনা। সর্বশেষ সংযোজন হলো চট্টগ্রাম বন্দরে ডেনমার্কভিত্তিক এপি মোলার মায়ের্স্কের লগিস্টিক বিনিয়োগ।
কিন্তু এই প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন প্রকৃত বিনিয়োগ আকৃষ্টে এখনও দৃশ্যমান নয়। বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের সূচক হিসেবে বিডায় নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাবের সংখ্যা কমছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এর নিট প্রবাহও হ্রাস পেয়েছে। শিল্পের মূলধনি যন্ত্র আমদানি নিম্নমুখী। সব মিলিয়ে দেখা যায়, প্রচার যত আলোচিত, প্রকৃত বিনিয়োগ পরিস্থিতি তার ঠিক বিপরীত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি) অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই–মার্চে এফডিআইয়ের নিট প্রবাহ ছিল ৮৬ কোটি ১০ লাখ ডলার, যেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১১৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে নিট এফডিআই ২৬ শতাংশ কমেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উইকলি সিলেকটেড ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস দেখাচ্ছে, মূলধনি যন্ত্র আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হয়েছে ১৫২ কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরে ছিল ২১৩ কোটি ৩৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ মূলধনি যন্ত্র আমদানি কমেছে ২৮ শতাংশ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২২.৪৮ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৩.৫১ শতাংশ। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ছয় মাস ধরে ৭ শতাংশের নিচে, যেখানে আগে তা ১০ শতাংশের বেশি। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, চৌধুরী আশিকের প্রচারমুখী কর্মকাণ্ডের বিপরীতে বাস্তব বিনিয়োগের সূচক কমিয়ে দিয়েছে উদ্বেগের মাত্রা, যা শিল্প এবং অর্থনীতির জন্য প্রভাব ফেলছে।
প্রশ্ন উঠছে, কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে আশিক মাহমুদকে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো? অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, সদ্য বিদায় নেওয়া প্রধান উপদেষ্টার একক ইচ্ছায় তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছিল।
আশিক ড. ইউনূসের পূর্বপরিচিত। ইউনূসের গ্রামীণ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পর্ক পুরোনো। সামাজিক ব্যবসার নামে তিনি অতীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য বিদেশ থেকে ব্যবসা এনেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এটি তার একমাত্র যোগ্যতা।
রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভবান করার উদ্দেশ্য নিয়েই ড. ইউনূস আশিককে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। দেশের জন্য কার্যকর কোনো অবদান না থাকলেও, তিনি গ্রামীণ এন্টারপ্রাইজ, গ্রামীণ টেলিকম ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের জন্য বিদেশে প্রচারণা করেছেন। অনেকের ধারণা, আসলে তিনি বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান নন, বরং ছিলেন গ্রামীণ ও ড. ইউনূসের মার্কেটিং ম্যানেজার।
এবার ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে বিদায় নেয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে, আশিককে দেশের অর্থনীতির জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা উচিত কি না। দেশি উদ্যোক্তাদের অভিমত, বিডার চেয়ারম্যান পদে অবিলম্বে একজন দক্ষ, যোগ্য ও বিনিয়োগবান্ধব ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।

