পেঁয়াজের ভরা মৌসুমে দেশের বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। মাঠ থেকে নতুন পেঁয়াজ তোলা শুরু হওয়ায় চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাইয়ের আড়তগুলো এখন পেঁয়াজে ভরপুর। পাইকারি বাজারে দাম কমলেও খুচরা বাজারে সেই সুবিধা পুরোপুরি পাচ্ছেন না ভোক্তারা। দোকানি ও ফড়িয়ারা তুলনামূলক বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাইয়ের আড়তদার ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে দেশি হালি জাতের পেঁয়াজ মানের দিক থেকে ভারতীয় ভালো মানের পেঁয়াজকেও টেক্কা দিচ্ছে। তাদের মতে, এই সময়ে পেঁয়াজ চাষিদের সহায়তায় সরকারের উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আড়তে দাম কম থাকলেও খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত লাভ করা হচ্ছে। ফলে বাজারে দাম কমার সুফল সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। পাইকারি বাজারে জাত, মান ও আকারভেদে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৮ থেকে ৪০ টাকায়। কিন্তু একই পেঁয়াজ খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে।
কৃষি উৎপাদন অঞ্চলগুলোতে এবার পেঁয়াজের ফলন ভালো হয়েছে। পাবনা, রাজবাড়ী ও কুষ্টিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। খাতুনগঞ্জের লামার বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস বলেন, ভালো মানের পেঁয়াজ বর্তমানে যে দামে বিক্রি হচ্ছে তাতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। একই সঙ্গে ভোক্তারাও তুলনামূলক কম দামে পেঁয়াজ কিনতে পারছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ৩৫ লাখ মেট্রিক টন। অন্যদিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাব বলছে, দেশে বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৮ লাখ টন। তবে উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হলেও সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়ে যায়। সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে উৎপাদন বেশি হলেও বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়। এই ঘাটতি পূরণ করতে প্রতিবছরই আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
গত বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) চট্টগ্রামের বড় ভোগ্যপণ্য পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাই ঘুরে দেখা যায়, প্রায় সব আড়তেই পেঁয়াজের মজুত রয়েছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে বাজারে আসা পেঁয়াজের শতভাগই দেশি। পাবনা, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ফরিদপুর ও মেহেরপুর থেকে এসব পেঁয়াজ আসছে।
মধ্য চাক্তাইয়ের আড়তদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স বশর অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী আবুল বশর বলেন, চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জের আড়তে এখন কোনো ভারতীয় পেঁয়াজ নেই। সবই দেশি পেঁয়াজ। ভালো মানের বড় আকারের হালি পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রমজানের শুরুতে এর দাম আরও বেশি ছিল।
তার মতে, দেশি হালি পেঁয়াজ মান ও সৌন্দর্যে ভারতীয় পেঁয়াজকে ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে। দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন হলে বিদেশ থেকে আমদানির প্রয়োজন হবে না এবং বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে। এ জন্য পেঁয়াজ চাষিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া জরুরি।
খাতুনগঞ্জের মেসার্স জামেনা ট্রেডিংয়ের পরিচালক মো. আজগর হোসেন জানান, এখন বাজারে দেশি হালি ও মুড়িকাটা—এই দুই ধরনের পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। মেহেরপুরি মুড়িকাটা পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ১৮ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর হালি পেঁয়াজ আকারভেদে ২৮ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জের হামিদউল্লা মিয়া বাজারের মেসার্স আল মুনিরীয়া ট্রেডার্সের ম্যানেজার মো. রবিউল বলেন, প্রায় প্রতিটি আড়তেই পেঁয়াজে ভরা। জায়গার সংকটে অনেক ব্যবসায়ী আড়তের বাইরে পেঁয়াজ রেখে দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ ট্রাক থেকেই সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পেঁয়াজ সরবরাহ করছেন। তিনি জানান, বাজারে বিভিন্ন মান ও আকারের পেঁয়াজ রয়েছে। বড় আকারের দেশি হালি পেঁয়াজ তারা ৩০ থেকে ৩২ টাকায় বিক্রি করছেন। একই সঙ্গে ১৮ থেকে ২০ টাকার পেঁয়াজও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
খাতুনগঞ্জে কিছু বিক্রেতা ফুটপাতে পাইকারি বাজার থেকে পেঁয়াজ কিনে খুচরা বিক্রি করেন। সেখানে মুড়িকাটা পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ৩০ টাকায় এবং হালি পেঁয়াজ ৩৫ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন মুদি দোকানেও প্রায় একই দামে পেঁয়াজ বিক্রি হতে দেখা গেছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ৫ মার্চের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ঢাকা মহানগরীর খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগে একই পেঁয়াজের দাম ছিল ৪৫ থেকে ৮০ টাকা কেজি। পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধানের প্রসঙ্গে আড়তদার আবুল বশর বলেন, অনেক খুচরা বিক্রেতা কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত লাভ করছেন।
ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বাজারে এখন পেঁয়াজের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। কিন্তু অনেক খুচরা বিক্রেতা অতিরিক্ত মুনাফা করছেন। এতে ভোক্তারা ন্যায্য সুবিধা পাচ্ছেন না। তার মতে, প্রশাসনের উচিত বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত নজরদারিতে রাখা এবং পাইকারি ও খুচরা দামের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা।

