মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, যদি যুদ্ধ আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এর প্রভাব কেবল গাড়িতে তেলের খরচেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; ঘর গরম করা, রান্না-বান্না এবং আমদানি করা নিত্যপণ্যও বিপুলভাবে দামী হয়ে উঠতে পারে।
কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থা ‘কাতারএনার্জি’ ইতিমধ্যেই তাদের এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করেছে। সংস্থা জানাচ্ছে, সরবরাহ চুক্তিতে ‘ফোর্স মেজিউর’ ধারা কার্যকর করা হয়েছে, অর্থাৎ অনিবার্য পরিস্থিতিতে চুক্তির বাধ্যবাধকতা সাময়িক স্থগিত। কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। যদি যুদ্ধ আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। এর ফলে গ্লোবাল জিডিপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং জ্বালানির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।”
শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম লাফ দিয়ে বেড়ে ৯৩ ডলারে পৌঁছেছে। এটি গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্য। যুক্তরাজ্যে গাড়ি চালকরা ইতিমধ্যেই তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব অনুভব করছেন। দেশটির গাড়ি চালকদের সংস্থা আরএসি জানিয়েছে, গত শনিবারের পর থেকে পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ৩.৭ পেন্স এবং ডিজেলের দাম ৬ পেন্স বেড়েছে। তবে গৃহস্থালি জ্বালানি বিল এখনই বাড়ছে না। কারণ অফজেম জুলাই পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করে রেখেছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে আসে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাতের কারণে এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো যদি তেল রফতানি করতে না পারে, তবে তাদের উৎপাদিত তেল মজুত করতে হবে। কিন্তু মজুত করার স্থান ফুরিয়ে গেলে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উৎপাদন বন্ধ করা ছাড়া কোনো বিকল্প থাকবে না। এমনকি যুদ্ধ থেমে গেলেও স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের পাইপলাইন হরমুজ ছাড়াই তেল পরিবহনের ব্যবস্থা রাখলেও, এই প্রণালির উপর যেকোনো হুমকি তেলের দাম আরও বাড়িয়ে দেবে।
বিশ্ববাজারে তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কেবল পরিবহন খরচ বাড়াবে না, খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বৃদ্ধি করবে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলো যেখানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসছিল, সেখানে এই সংকট মুদ্রাস্ফীতিকে পুনরায় ত্বরান্বিত করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের জরুরি তেলের মজুদ বাজারে ছেড়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করবে, তবে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পরিস্থিতিতে বিশ্ব একটি বড় অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পড়তে পারে।

