মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও চট্টগ্রাম বন্দরের পথে রয়েছে তেল ও গ্যাসবাহী একাধিক জাহাজ। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আগেই পারস্য উপসাগরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এসব জাহাজ বাংলাদেশমুখী হয়। এরই মধ্যে কয়েকটি জাহাজ বন্দরে পৌঁছেছে, আবার কয়েকটি এখনো পথে রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, মোট ১০টি জাহাজে করে প্রায় পৌনে চার লাখ টন জ্বালানি পণ্য দেশে আসছে। এসব জাহাজের মধ্যে চারটিতে রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), দুটিতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এবং বাকি চারটিতে রয়েছে ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর তেহরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বাড়ে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ হওয়া তেল ও এলএনজির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ পরিবহন হয়। ফলে পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্যের সাত দেশ—ইরাক, ইরান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব থেকে। এসব পণ্য পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে ওমান উপসাগর, আরব সাগর, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর হয়ে বাংলাদেশে পৌঁছায়। তবে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রণালির পাশের দেশ ওমান থেকেও পরিবহন ঝুঁকি বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানিবাহী জাহাজের আগমন নিয়ে আলোচনাও বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় গত শুক্রবার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি তেল বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ করেছে।
চার জাহাজে এলএনজি:
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, কাতার থেকে প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ‘আল জোর’ ও ‘আল জাসাসিয়া’ নামের দুটি জাহাজ ইতিমধ্যে বন্দরে পৌঁছেছে। আরও দুটি জাহাজ—‘লুসাইল’ ও ‘আল গালায়েল’—আগামী সোমবার ও বুধবার বন্দরের জলসীমায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে চারটি জাহাজে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টন এলএনজি রয়েছে। কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে সংঘাত শুরুর দুই থেকে সাত দিন আগেই এসব জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে।
এলএনজি জাহাজগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধি ইউনি গ্লোবাল বিজনেস লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ উপমহাব্যবস্থাপক মো. নুরুল আলম জানান, চারটি জাহাজই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চট্টগ্রামে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ‘লিব্রেথা’ নামের আরেকটি এলএনজিবাহী জাহাজ এখনো হরমুজ প্রণালির ভেতরে অবস্থান করছে। জাহাজটিতে এলএনজি বোঝাই করা হয়েছে এবং এটি প্রণালি পার হওয়ার অপেক্ষায় আছে। পরবর্তী চালানগুলো নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে বলেও তিনি জানান। সরকারও সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। খোলাবাজার থেকে বেশি দামে দুটি এলএনজি জাহাজ কেনা হয়েছে, যেগুলো এখনো বন্দরে পৌঁছায়নি।
দুটি জাহাজে এলপিজি
বাংলাদেশে এলপিজির বড় অংশ আমদানি করা হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সংঘাত শুরুর আগেই ওমান উপসাগরীয় পথে ‘সেভান’ নামের একটি জাহাজ চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়। জাহাজটি আজ রোববার বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এতে রয়েছে ২২ হাজার ১৭২ টন এলপিজি, যা ওমানের সোহার বন্দর থেকে আনা হচ্ছে।
এর আগে একই বন্দর থেকে ‘জি ওয়াইএমএম’ নামের আরেকটি এলপিজিবাহী জাহাজ বন্দরে পৌঁছেছে। এতে ছিল ১৯ হাজার ৩১৬ টন এলপিজি। সব মিলিয়ে দুটি জাহাজে এলপিজির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৪৮৮ টন। শিপিং এজেন্টদের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার টন এলপিজি মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির জন্য আনা হয়েছে। বাকি অংশ এনেছে জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস লিমিটেড।
ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য
ডিজেলের মজুত কমে আসার প্রেক্ষাপটে ‘এসপিটি থেমিস’ নামের প্রায় ৩১ হাজার টন ডিজেলবাহী একটি জাহাজ চট্টগ্রামের পথে রয়েছে। জাহাজটি আগামী ১২ মার্চ বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে বলে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মালয়েশিয়া থেকে ১৪ হাজার টন গ্যাসের উপজাত কনডেনসেট নিয়ে ‘হুয়া সুন’ নামের একটি জাহাজ ইতিমধ্যে বন্দরে পৌঁছেছে। এই কনডেনসেট থেকে ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও এলপিজি উৎপাদন করা হয়। সিঙ্গাপুর থেকে ৪০ হাজার টন ফার্নেস তেল নিয়ে আরও দুটি জাহাজও বন্দরে এসেছে। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর ৪ মার্চ এলপিজি ও ডিজেলবাহী দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। ‘ওরিয়েন্টাল গ্রিনস্টোন’ ও ‘পল’ নামের ওই জাহাজ দুটি তেল-গ্যাস খালাস করে শুক্রবার বন্দর ছেড়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের এসব দেশ থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যার বড় অংশই জ্বালানি। তবে প্রণালি ঘিরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ভবিষ্যতে নতুন জাহাজ আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

