চলমান ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের মধ্য দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি আবারও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ে যেমন অর্থনৈতিক ধাক্কা লেগেছিল, এবার পরিস্থিতি তার চেয়েও জটিল এবং প্রভাব বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্লেষকরা।
বিশ্ববাজারে ইতিমধ্যেই তেলের দাম ৯০ ডলার ছাড়িয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার পর দাম হু হু করে বাড়ছে। এই নৌপথের মাধ্যমে তেল ছাড়াও সারসহ বিভিন্ন জরুরি পণ্য পরিবাহিত হতো। প্রণালি বন্ধ হওয়ায় এসব পণ্যের দামও বৃদ্ধি পাবে, যা বিশ্বের প্রতিটি দেশের জন্য সংকট তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন পরিস্থিতিতে সঠিক কৌশল প্রণয়ন জরুরি।
একই সঙ্গে, বিশ্ব খাদ্য সংস্থা জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বেড়েছে। যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, খাদ্যের দাম আরও বাড়বে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামনের সময় বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কঠিন হবে, এবং বাংলাদেশও এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে না। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, এটি শুধু সাময়িক ধাক্কা মাত্র।
পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর বাজারের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সংযত ছিল। তেলের দাম প্রথমে প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে দাম নিম্নমুখী থাকায়, এই বৃদ্ধি খুব বড় ধরনের সংকটের সংকেত দেয়নি।
কিন্তু শুক্রবার পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। বাজারে নতুনভাবে উদ্বেগ দেখা দেয়। কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল কাবি সতর্ক করেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানিকারকেরা কয়েক দিনের মধ্যেই রপ্তানি বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারেন। তিনি জানান, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই মন্তব্যের পর বাজারে অস্থিরতা আরও বেড়ে গেছে। সংঘাত শুরুর পর থেকে অপরিশোধিত তেলের দাম ইতিমধ্যেই প্রায় ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি শুধু তেল নয়, খাদ্য, সার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দামকেও প্রভাবিত করতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সামনে চ্যালেঞ্জগুলো খুবই জটিল এবং তা মোকাবিলায় প্রণীত কৌশল দ্রুত প্রয়োজন।
মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও শিল্প উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় নানা পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের দামও দ্রুত বাড়ছে। জেট জ্বালানি থেকে শুরু করে ইউরিয়া—এসব পণ্য সরবরাহ নির্ভর করে হরমুজ প্রণালির অবাধ জাহাজ চলাচলের ওপর। নৌপথে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ সীমিত হয়ে দাম বাড়তে শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ জ্বালানিসংকট শুরু হয়নি। তবে বাজার আরও সতর্ক হয়ে পরিস্থিতির সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি সংকট চলমান থাকে, আগামী সপ্তাহেই তেলের দাম ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করতে পারে।
ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা না করলেও বাস্তবে নৌপথ প্রায় অচল হয়ে গেছে। যুদ্ধ ঝুঁকির কারণে জাহাজ চলাচলের বিমা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে, ফলে অনেক জাহাজমালিক স্বেচ্ছায় এই পথে যাতায়াত বন্ধ করেছেন। এতে মূল্যস্ফীতির ঢেউ আসতে পারে, যা কেবল যুক্তরাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিশ্বের সব বাজারে তার প্রভাব পড়বে। জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্য ও শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিক কাঁচামাল—সবকিছুর বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ঋণবাজারেও নতুন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, “রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় থেকে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চক্র শুরু হয়েছে, তা এখনও কমানো যায়নি। এবার ইসরায়েল–ইরান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যাবে। মূল্যস্ফীতি একবার বেড়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এটি হবে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো।” পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিল্প উৎপাদনেও প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে না।
সংঘাতের আগে থেকেই খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল
পাঁচ মাসের বিরতির পর বিশ্বজুড়ে আবার খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছে, যা মূলত ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের প্রভাবে বাজারে উদ্বেগের সঙ্গে মিলিত।
এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত গম, ভোজ্যতেল ও মাংসের দাম বৃদ্ধির কারণে ফেব্রুয়ারি মাসে খাদ্যপণ্যের সামগ্রিক মূল্য বেড়েছে। যদিও পনিরসহ কিছু দুগ্ধজাত পণ্য ও চিনির দাম কিছুটা কমেছে, তাতেও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমেনি। এফএওর খাদ্যপণ্য সূচক ফেব্রুয়ারিতে ১২৫.৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। জানুয়ারি মাসে এটি ছিল ১২৪.২। অর্থাৎ এক মাসে বেড়েছে ১.১ পয়েন্ট। বছরের তুলনায় বিশ্বজুড়ে খাদ্যসামগ্রীর দাম এখনও এক শতাংশ কম। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার সেনা অভিযানের পর খাদ্যপণ্যের দাম যেখানে পৌঁছেছিল, বর্তমানে তা প্রায় ২২ শতাংশ কমে গেছে।
ফেব্রুয়ারি মাসে ভোজ্যতেলের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভোজ্যতেলের দাম ৩.৩ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০২২ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ। গমের দাম বেড়েছে ১.১ শতাংশ। তুলনায় চালের দাম খুব সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে মাংসের—প্রায় ৮ শতাংশ। অন্যদিকে দুগ্ধজাত পণ্যের দাম জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে ১.২ শতাংশ কমেছে। চিনির দাম কমেছে ৪.১ শতাংশ।
বাংলাদেশে কী প্রভাব
এই প্রেক্ষাপটে ২০২২ সালের সংকটের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। তখন জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ ১৩৯ ডলারে পৌঁছেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে বর্ধিত দামে তেল আমদানি করতে গিয়ে রিজার্ভ সংকট দেখা দিয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে আমদানি কমাতে হয়েছিল, আর মূল্যস্ফীতির সূচক লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে গিয়েছিল। বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে অন্য দেশগুলো কিছুটা বেরিয়ে এসলেও বাংলাদেশ চার বছরেও সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বর্তমানে যদি তেলের দাম ১০০ ডলারের বেশি হয়, তার প্রভাব কেমন হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
ঝুঁকির আরেকটি বড় দিক হলো প্রবাসী আয়। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্তিমিত হলে বাংলাদেশের শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সম্প্রতি কাতারের একটি ডেটা সেন্টারে ইরান হামলা করেছে, যার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে পড়েছে। এর ফলে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। নতুন শ্রমিক পাঠানোও কমতে পারে।
রপ্তানি খাতেও প্রভাব পড়তে পারে। হরমুজ প্রণালি সরাসরি ব্যবহার না করলেও, মধ্যপ্রাচ্যে আতঙ্কের কারণে জাহাজ চলাচলের বিমা ব্যয় বেড়ে গেছে। অনেক রপ্তানিকারক ঝুঁকি এড়িয়ে উত্তমাশা অন্তরীপ ব্যবহার করছেন।
নতুন সরকার যে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে চাইছে, তা ব্যাহত হতে পারে। বিনিয়োগ ও আমদানির সম্পর্কের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিনিয়োগেও প্রভাব পড়বে। এছাড়া নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। এই যুদ্ধ ভৌগোলিকভাবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও বড়। ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ প্রভাবিত হয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, “রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় শুরু হওয়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির চক্র থেকে আমরা এখনো বেরোতে পারিনি। মূল্যস্ফীতি একবার বেড়ে গেলে তা কমানো কঠিন। ইসরায়েল–ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এটি হবে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো।” অধ্যাপক রায়হান মনে করছেন, সরকারের উচিত:
-
তেল সংক্রান্ত যথাযথ তথ্য জনগণের কাছে তুলে ধরা, যাতে অপতথ্যের সুযোগ কেউ নিতে না পারে। মজুত, রেশনিং ও সরকারি উদ্যোগ সব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।
-
জাতীয় ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে কৃচ্ছ্রসাধন নিশ্চিত করা।
-
বাজেট ও অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করা।
-
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, যাতে বিপদের সময়ে সাধারণ মানুষ সুরক্ষিত থাকে।
এই পরিস্থিতি শুধু তেলের দাম নয়, প্রবাসী আয়, রপ্তানি ও বিনিয়োগ—সবক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া এখন সময়োপযোগী।
যুদ্ধের ব্যয় বাড়াতে ইরানের পরিকল্পনা
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাহরাইনের তেল স্থাপনা, কাতারের গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র, দুবাইয়ের পাম দ্বীপসংলগ্ন বন্দর ও কুয়েতের উপকূলে নোঙর করা তেলবাহী ট্যাংকার—বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক হামলা হয়েছে। এসব ঘটনার পর বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে ইরান কি পরিকল্পিতভাবে এই কৌশল নিয়েছে।
সংঘাতের প্রভাব কেবল যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যায় না। বরং অনেকের মতে, অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা এই যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে পরিস্থিতির সঠিক পরিণতি অনুমান করা কঠিন হয়ে গেছে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে যে নতুন মূল্যস্ফীতির ঢেউ তৈরি হচ্ছে, তা ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়বে। এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতির নানা প্রান্তে অনুভূত হবে। যুদ্ধের আঁচ থেকে কেউই রেহাই পাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, “এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত এখনো রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশকে আরও বেশি ডিজেল আমদানি করার সুযোগ দিতে পারে।”
চলমান সংঘাত এবং ধারাবাহিক হামলার প্রভাব শুধু তেল ও জ্বালানি নয়, খাদ্য, শিল্প পণ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতির সবখাতেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই বিশ্ব ও বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

