মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব এবার দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। সম্ভাব্য দাম বৃদ্ধির আশঙ্কায় অনেক ভোক্তা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি করে তেল কিনতে শুরু করেছেন। এর ফলে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে হঠাৎ করেই বোতলজাত সয়াবিন তেলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
খুচরা বাজারে এখনো সরকার নির্ধারিত দামে তেল বিক্রি হলেও সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক ক্রেতা বাড়তি তেল কিনছেন। বিক্রেতারা বলছেন, এই অতিরিক্ত কেনাকাটার কারণেই বাজারে চাপ আরও বেড়ে গেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ দোকানেই পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই।
শেওড়াপাড়া, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, শাহজাদপুর, দক্ষিণ বনশ্রী ও মেরাদিয়া এলাকার অনেক দোকানে পাঁচ লিটারের বোতল একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও এক বা দুই লিটারের বোতল সীমিত পরিমাণে পাওয়া গেলেও অনেক দোকানে সেটিও মিলছে না।
ফলে প্রয়োজনীয় তেল কিনতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন ক্রেতারা।
শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, তার দরকার ছিল দুই লিটারের একটি বোতল। কিন্তু আশপাশের কয়েকটি দোকান ও বাজার ঘুরেও না পেয়ে শেষ পর্যন্ত পাঁচ লিটারের বোতল কিনতে বাধ্য হয়েছেন।
তার মতো অনেক ক্রেতাই আশঙ্কা থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনছেন বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবির জানান, সাধারণ সময়ে তিনি প্রতিদিন ডিলারের কাছ থেকে প্রায় ৮ থেকে ১০ কার্টন তেল আনতেন। কিন্তু গত কয়েক দিনে সেই পরিমাণ কমে দুই থেকে তিন কার্টনে নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণেই বাজারে বোতলজাত তেলের সংকট তৈরি হয়েছে।
বিক্রেতাদের মতে, গত এক সপ্তাহ ধরে কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে তেলের সরবরাহ তুলনামূলক কম। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির খবর যুক্ত হওয়ায় অনেক ক্রেতা আতঙ্কে বেশি করে তেল কিনছেন। ফলে বাজারে সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে কয়েকটি ডিলারের দোকানে এখন খুচরা বিক্রেতাদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে দোকানিরা সেখানে গিয়ে তেল সংগ্রহ করার চেষ্টা করছেন।
তবে অনেকেই চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না।
মগবাজার এলাকার এক বিক্রেতা মো. পলাশ জানান, আগে তিনি একসঙ্গে চার কার্টন তেল কিনতেন। এখন ডিলাররা তাকে এক কার্টনের বেশি দিচ্ছেন না।
সরকার নির্ধারিত হিসাবে পাঁচ লিটারের বোতল সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) ৯৫৫ টাকা।
কিন্তু আগে ডিলারের কাছ থেকে এই বোতল প্রায় ৯৩০ টাকায় পাওয়া যেত। এখন অনেক দোকানদারকে ৯৫০ টাকা পর্যন্ত দিয়ে কিনতে হচ্ছে।
ফলে খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফাও কমে গেছে।
বোতলজাত তেলের সংকটের প্রভাব পড়েছে খোলা তেলের বাজারেও।
কারওয়ান বাজারে গত চার দিনে খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি কেজিতে প্রায় ৫ টাকা বেড়ে ১৯৮ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া খোলা পাম তেলের দামও বেড়ে প্রতি কেজি প্রায় ১৭০ টাকায় পৌঁছেছে।
তবে তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে সরবরাহ সংকটের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ফ্রেশ ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল উৎপাদনকারী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ জানিয়েছে, তারা নিয়মিত বাজারে তেল সরবরাহ করছে এবং উৎপাদনেও কোনো ঘাটতি নেই। রমজান সামনে রেখে অতিরিক্ত তেল আমদানিও করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেছে।
এদিকে সিটি গ্রুপের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান সরবরাহ কমায়নি।
তার মতে, এলসি-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে কিছু ছোট কোম্পানি তেল আমদানি করতে পারছে না। পাশাপাশি রমজানে চাহিদা বৃদ্ধি এবং কিছু মানুষের মজুদ করার প্রবণতার কারণেও বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ জানিয়েছেন, বাজারে তেল সরবরাহে সংকটের বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখবেন।
তিনি বলেন, যদি কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়ে থাকে, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

