বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বিএসইসি এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা উচিত। এসব প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা দেওয়া হলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হবে। বিশেষত কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন গতকাল ঢাকার এফডিসিতে শিক্ষার্থীদের একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন। ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ আয়োজিত এই ‘ছায়া সংসদ’ প্রতিযোগিতায় সরকারি দল হিসেবে অংশ নেয় প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি এবং বিরোধী দল হিসেবে অংশ নেয় ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।
ড. খাতুন বলেন, “অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও আইনের শাসনের অভাব থাকলে বিনিয়োগের গতি বাধাগ্রস্ত হবে।” তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক ধরনের সংকটকালীন অবস্থায় আছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত রাজস্ব আয়, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং জ্বালানি খাতে সংকট সামষ্টিক অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে রাখছে। “মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সঠিক নীতি গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ,” বলেন তিনি।
নতুন সরকারের প্রতি পরামর্শে ড. খাতুন বলেন, “উন্নয়নকে কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা যাবে না। নিশ্চিত করতে হবে উন্নয়নের সুফল সবাই পাবে। ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগ ভালো, তবে সবচেয়ে জরুরি ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যাতে মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতার মাধ্যমে মানুষকে কাজের সুযোগ দিতে হবে।”
দর্শকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বিশেষায়িত এবং রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান। এটি অর্থনীতিতে সম্পদের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং জনগণের অর্থের সুরক্ষা দেয়। তবে অতীতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে এবং অনেক সময় নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি।
ড. খাতুন বলেন, “অর্থনীতির ৮০ শতাংশই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। ব্যবসায়ীদের ওপর ঢালাওভাবে চাপ প্রয়োগ না করে, অন্যায়কারীদের আইনের আওতায় আনা উচিত। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যাতে ব্যবসায়ীদের ওপর প্রভাব ফেলতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।”
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “উচ্চমূল্যে জ্বালানি তেল কিনতে হলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। অন্যদিকে ভর্তুকি দিলে সরকারের কোষাগারে চাপ তৈরি হবে। এছাড়া এই অঞ্চলে কর্মরত প্রবাসীদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে রেমিট্যান্স আহরণও কমে যাবে।”
সভাপতির বক্তব্যে হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, “অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করা, ব্যাংক হিসাব অবরোধ দূর করা এবং দেশে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব সামলাতে নতুন সরকারের জন্য অর্থনৈতিক পুনর্গঠন কঠিন হয়ে যাবে।”

