সরকার একটি বিস্তৃত নীতি প্রণয়নের কাজ করছে, যা মূলত কর ছাড়া রাজস্ব সংগ্রহ এবং ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো বন্ধ করে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।
‘কর নয় রাজস্ব ও অন্যান্য করসংক্রান্ত রাজস্ব সংগ্রহ ও সঠিক ব্যবস্থাপনা ২০২৬’ শিরোনামের এই খসড়া নীতিতে বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো দেশের ঋণ ও অনুদান নির্ভরতা কমিয়ে রাজস্ব উৎস বৈচিত্র্য আনতে সহায়ক হবে। নীতিতে পরিবেশভিত্তিক কর, ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক শৃঙ্খলা কড়া করার দিকে জোর দেওয়া হয়েছে। এটি দেশের রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো এবং সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি অংশ।
পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব বৃদ্ধি
নীতিতে “সবুজ” কর বা চার্জ চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। একটি কার্বন কর প্রবর্তন করার পরিকল্পনা আছে, যা বড় দূষক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করবে। শুরুতে লক্ষ্য হচ্ছে এমন শিল্পগুলো, যারা বছরে ২৫,০০০ টন বা তার বেশি কার্বন নিঃসরণ করে। ছাপ্রদূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিক ব্যবহার ও পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্যও ফি বসানোর প্রস্তাব রয়েছে। পরিবেশ-বান্ধব নয় এমন ব্যক্তিগত যানবাহনগুলোকে বেশি কার্বন ফি দিতে হতে পারে।
নতুন নীতিতে নগর ও প্রধান মহাসড়কে ইলেকট্রনিক রোড প্রাইসিং চালু করার কথাও বলা হয়েছে। এতে যানজট নিয়ন্ত্রণ হবে এবং অতিরিক্ত রাজস্বও আসবে। নির্ধারিত ইলেকট্রনিক রোড প্রাইসিং গেটে যানবাহন গেলে চার্জ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেওয়া হবে। ট্রাফিকের চাপ অনুযায়ী ফি পরিবর্তিত হবে, এবং চরম সময়ের বেশি চার্জ জনসাধারণকে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করতে উৎসাহিত করবে।
রাজস্ব ফাঁক বন্ধে ডিজিটাল রূপান্তর:
খসড়া নীতিতে রাজস্ব ফাঁক রোধে সম্পূর্ণ ডিজিটাল রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। একটি কেন্দ্রীভূত সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরি করা হবে, যা মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর রাজস্ব সংগ্রহ রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করতে সাহায্য করবে। সব সরকারি লেনদেন স্বয়ংক্রিয় চালান ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।
এছাড়া, ট্রেজারি একক হিসাব ব্যবস্থা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ সব রাজস্ব সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হবে এবং কোনো সরকারি অফিস পূর্ব অনুমোদন ছাড়া ব্যাঙ্কে রাজস্ব রাখতে পারবে না।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে আর্থিক শৃঙ্খলা
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর পরবর্তী নেট মুনাফার অন্তত ৩০ শতাংশ সরকারকে লভ্যাংশ হিসেবে জমা দিতে হবে। এছাড়া, রাষ্ট্র থেকে ঋণ নেওয়া সরকারি সংস্থাগুলিকেও কঠোর সময়সীমা মেনে ঋণ পরিশোধ করতে হবে; না মানলে জরিমানা বা সুদ ধার্য হতে পারে।
সরকারি বা খাস জমির ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। চিরস্থায়ী মালিকানা থেকে দূরে সরে দীর্ঘমেয়াদি লিজ ব্যবস্থা চালু করা হবে এবং ল্যান্ড ব্যাংক সিস্টেম তৈরি করা হবে। এতে ব্যবহারহীন জমির সদ্ব্যবহার সম্ভব হবে এবং সরকার ও বেসরকারি সংস্থার যৌথ উদ্যোগ (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ)ের মাধ্যমে জমি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
নীতির বাস্তবায়ন: নীতি বাস্তবায়নের জন্য দুটি মূল তদারকি সংস্থা গঠন করা হবে।
- একটি উচ্চ-স্তরের টাস্ক ফোর্স, অর্থ সচিবের নেতৃত্বে, রাজস্ব সংক্রান্ত ফি কাঠামো পর্যালোচনা ও অনুমোদন করবে।
- অন্যদিকে, ফি সংশোধন কমিটি তিন বছরে একবার সরকারি সেবার ফি পুনঃমূল্যায়ন করবে।
ফি, জরিমানা, লভ্যাংশ এবং পরিবেশকর নীতিভুক্ত করার মাধ্যমে সরকার আশা করছে অতিরিক্ত রাজস্ব সরবরাহ হবে, যা উন্নয়নমূলক খরচ বাড়াতে সহায়ক হবে। খসড়া নথিতে বলা হয়েছে, “নীতির সফল বাস্তবায়ন সরাসরি রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি করবে, যা অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।”
যদি অনুমোদিত হয়, এই নীতি কর নয় রাজস্ব উৎস ব্যবস্থাপনার একটি কাঠামো দেবে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করবে। এছাড়া, নীতি কার্যকর হওয়ার পর ২০২৪ সালের ‘কর নয় এবং নন-এনবিআর কর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা’ বাতিল বলে গণ্য হবে।

