সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে বেসরকারি চারটি সিআরইউ রিফাইনারি থেকে জ্বালানি তেল কিনেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এতে তিন মাসে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটির ২৮ কোটি টাকা ‘গচ্চা’ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মন্ত্রণালয় গঠিত উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি এ ঘটনায় প্রায় ১৮ কোটি টাকা ক্ষতির প্রমাণ পেয়েছে।
তদন্তে যথাযথ প্রমাণ সত্ত্বেও সরকারি অর্থ উদ্ধারের বা মূলহোতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এতে সংশ্লিষ্টদের ব্যক্তিগত লাভের বিষয়টিও নজরে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্দেশ অমান্য করে বেসরকারি সিআরইউ প্ল্যান্ট থেকে তেল কেনা হয়েছে। যোগসাজশের মাধ্যমে বেশি টাকা পরিশোধ করে সংশ্লিষ্টরা লাভবান হয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটিও এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেনি। বোর্ড সভায় বিষয়টি তোলার নির্দেশ জ্বালানি বিভাগ বিপিসিকে দিলেও ৮ মার্চ পর্যন্ত তা বোর্ডে ওঠেনি।
জানা গেছে, বিপিসি আমদানির পাশাপাশি দেশীয় চারটি বেসরকারি সিআরইউ রিফাইনারি থেকে জ্বালানি তেল কিনে বিক্রি করে। তেলের ক্রয়মূল্য নির্ধারণে সরকারি আদেশ উপেক্ষা করে বিলম্বিত প্রজ্ঞাপন দেওয়ার মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে গত অর্থবছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে বিপিসি প্রায় ২৮ কোটি টাকা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বেসরকারি প্ল্যান্ট থেকে তেল কেনায় বিজ্ঞপ্তি বিলম্বের কারণে ক্ষতির বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হলেও দায় নির্ধারণ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়নি। মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন বিপিসিতে পাঠিয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী বোর্ড সভায় বিষয়টি উত্থাপন করা হবে—তদন্ত কমিটির সদস্য ও বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা জানিয়েছেন।
এই বিষয়ে প্রথম অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ২২ নভেম্বর জাগো নিউজে, শিরোনাম—‘বেসরকারি প্ল্যান্টের তেল কিনে ৩ মাসে বিপিসির ‘গচ্চা’ ২৮ কোটি টাকা’। পরের দিন তা আরেকটি পত্রিকায় হুবহু প্রকাশিত হয়। তথ্য অধিদপ্তরের বরাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপদেষ্টা মোহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের নজরে এলে অভিযোগটি তদন্তের নির্দেশ দেন।
এরপর ৪ ডিসেম্বর যুগ্ম সচিব মোছা. লায়লাতুল ফেরদৌসকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব আসিফ আহমেদকে সদস্য সচিব করা হয়। পরে ১৩ ডিসেম্বর কমিটি পুনর্গঠন করে মো. জিয়াউল হককে আহ্বায়ক করা হয়। মোছা. লায়লাতুল ফেরদৌসকে মন্ত্রণালয়ের নীতিবান, কঠোর ও দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত।
গত ১ ফেব্রুয়ারি তদন্ত কমিটি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। এক মাস পর, ১ মার্চ, উপ-সচিব মো. বজলুর রশীদের স্বাক্ষরিত একটি দাপ্তরিক চিঠিতে বিপিসি চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেওয়া হয়, যাতে তদন্ত কমিটির সুপারিশগুলো বোর্ড সভার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত ২৮ কোটি টাকার ক্ষতির রিপোর্টের তুলনায় তদন্ত কমিটি বিপিসি থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে তিন মাসে ১৭ কোটি ৭৮ লাখ ৯৭ হাজার ৩১৯ টাকা ৫৯ পয়সা আর্থিক ক্ষতি নির্ধারণ করেছে। তদন্তে উঠে এসেছে, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি বিপিসির প্রাইসিং কমিটির আহ্বায়ক ড. এ কে এম আজাদুর রহমান এবং সদস্য সচিব শাহরিয়ার মোহাম্মদ রাশেদের সঙ্গে শুনানি নেওয়া হয়। পরে প্রাইসিং সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়।
কমিটির পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২২ সালে প্রাইসিং কমিটি গঠনের পর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত শাহরিয়ার মো. রাশেদ সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া জুলাই ২০২৪ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত কোনো মাসে নির্দেশিত ৭ তারিখের মধ্যে মূল্য বিজ্ঞপ্তি জারি হয়নি।
প্রতিবেদন বলছে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ১০-১০-২০২২ তারিখের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বিপিসির প্রাইসিং কমিটির দায়িত্ব ছিল প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেলের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ ও বিজ্ঞপ্তি জারি করা। বাস্তবে, বিজ্ঞপ্তি জারি করতে অতিরিক্ত ৩ থেকে ১০ দিন সময় লেগেছে, যা আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব ‘চলমান প্রশাসনিক প্রক্রিয়া’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর বলেন, “কার কী দায়, সেটা বাদে এখানে রাষ্ট্রের টাকা গচ্চা গেছে। প্রাথমিকভাবে যারা দায়ী প্রমাণিত হয়েছে, তাদের সাসপেন্ড করা উচিত ছিল। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘটনা ঘটলে বিভাগীয় মামলা দিয়ে দায় নির্ধারণ করা উচিত ছিল।”
তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বোর্ড সভার কার্যবিবরণী প্রস্তুত, সদস্যদের স্বাক্ষর সংগ্রহ, নথি উপস্থাপন ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের কারণে বিলম্ব হয়েছে। তবে, এটি একবারের ঘটনা নয়, বরং একাধিক মাসে পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। অভিযোগের পর বিপিসি একটি কমিটি গঠন করে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন পেশের নির্দেশ দেয়, কিন্তু কমিটি তিন মাস পর ‘বিষয়টি স্পর্শকাতর’ উল্লেখ করে অপারগতা প্রকাশ করে। পরবর্তী সময়ে প্রাইসিং কমিটির সদস্য সচিবকে অন্য বিভাগে বদলি করা হয়। এর পর নিয়মিতভাবে মূল্য বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়ায় বিপিসির আর্থিক ক্ষতি বন্ধ হয়। এটি অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও আরও জোরদার করে।
বিপিসির প্রাইসিং কমিটির সদস্য সচিব শাহরিয়ার মোহাম্মদ রাশেদ করপোরেশনের নিজস্ব ডিজিএম পর্যায়ের কর্মকর্তা। অন্যদিকে প্রাইসিং কমিটির আহ্বায়ক ড. এ কে এম আজাদুর রহমান প্রেষণে নিযুক্ত কর্মকর্তা। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তাকে প্রেষণে নিযুক্ত করলে তার কাজ বুঝিয়ে দেওয়া ও নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব থাকে সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কর্মকর্তাদের।
ড. এ কে এম আজাদুর রহমান ৫ মার্চ ২০২৫ তারিখে পরিচালক (অপারেশন ও পরিকল্পনা) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং প্রাইসিং কমিটির আহ্বায়ক হন। অন্যদিকে শাহরিয়ার মোহাম্মদ রাশেদ ২০২২ সাল থেকে প্রাইসিং কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে নির্ধারিত সময়ে মূল্য নির্ধারণী বিজ্ঞপ্তি জারির গুরুত্ব তার জানা ছিল।
তবে রাশেদ যথেষ্ট সময় নিয়ে সভা আহ্বান, কার্যবিবরণী অনুমোদন ও নথি উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের উদ্যোগ নেননি। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে কর্তব্যে অবহেলা হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে মার্চ ২০২৫ থেকে মে ২০২৫ পর্যন্ত বিপিসি ১৭ কোটি ৭৮ লাখ ৯৭ হাজার ৩১৯ টাকা ৫৯ পয়সা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তদন্ত কমিটি চারটি মূল মতামত ও সুপারিশ উপস্থাপন করেছে। কিন্তু ক্ষতির টাকা উদ্ধারের জন্য কোনো সুপারিশ করা হয়নি। প্রতিবেদনের প্রধান সুপারিশগুলো ছিল:
-
প্রাইসিং ফর্মুলা অনুযায়ী ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের মূল্য পুনঃনির্ধারণ ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না হওয়ায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে বিপিসির ক্ষতির গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রাথমিক সত্যতা স্বীকার করা।
-
অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ে দায় নির্ধারণ এবং দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
-
ভবিষ্যতে প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে মূল্য নির্ধারণী প্রজ্ঞাপন না হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া।
-
বিপিসির প্রাইসিং প্রক্রিয়ার অটোমেশন চালু করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্য নির্ধারণ ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া।
তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য ১ মার্চ বিপিসি চেয়ারম্যানকে মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। কমিটির আহ্বায়ক, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জিয়াউল হক বলেন, “আমরা প্রতিবেদনে মতামত ও সুপারিশ জানিয়েছি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সত্যতা পাওয়া গেছে। দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আলাদা কমিটি গঠন করার সুপারিশ করেছি। তদন্ত থেমে যায়নি, আরও পর্যায়ক্রমিক তদন্ত হবে।”
এই বিষয়ে তদন্ত কমিটির সদস্য ও বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা বলেন, “বেসরকারি প্ল্যান্টগুলো থেকে তেল কেনায় বিলম্বের কারণে বিপিসি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কার দায় কতটুকু, তা নির্ধারণে অধিকতর তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। মন্ত্রণালয় প্রতিবেদনটি বিপিসিতে পাঠিয়েছে। এখন নির্দেশনা অনুযায়ী বিষয়টি আগামী বোর্ড সভায় তোলা হবে।”
গত বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) বিপিসি সচিব আগামী বোর্ড সভায় প্রাইসিং কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন উত্থাপন করার কথা জানিয়েছিলেন। তবে বিশ্বস্ত সূত্র জানাচ্ছে, বিষয়টি এবারের বোর্ড সভায় তোলা হচ্ছে না। এজেন্ডা বেশি হওয়াকে অজুহাত দেখিয়ে প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, “সচিব বোর্ড সভায় এজেন্ডা উত্থাপন করতে পারেন, কিন্তু চেয়ারম্যানের নির্দেশ ছাড়া এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তাই প্রাইসিং কমিটির প্রতিবেদন পরবর্তী বোর্ড সভায় নেওয়া হচ্ছে।”
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে দাপ্তরিক মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। সমালোচকরা বলছেন, সরকারি অর্থ তছরুপে জড়িতদের রক্ষা করতে চায় তদন্ত কমিটি। সরকারি সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া প্রশ্ন তুলেছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, “কার কী দায়, সেটা বাদে রাষ্ট্রীয় টাকা গচ্চা গেছে। সে টাকা কে দেবে? তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, ঘটনার সত্যতা পেয়েছে। প্রাথমিকভাবে যারা দায়ী প্রমাণিত হয়েছে, তাদের সাসপেন্ড করা উচিত ছিল। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়; তারা ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সাসপেন্ড করে বিভাগীয় মামলা করা উচিত ছিল।”
তিনি আরও বলেন, “বিপিসি নানান দোষে দুষ্ট একটি সংস্থা। তদন্ত কমিটি একটি আইওয়াশ। কোনো সমালোচনা এলে গণমাধ্যমের চাপের কারণে নিয়ম রক্ষার জন্য কমিটি গঠন করা হয়, কিন্তু ফলাফল সাধারণ মানুষ জানতে পারে না। পরে দেখা যায়, দোষীদের মওকুফ করা হয়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ উদ্ধারে কোনো ব্যবস্থা হয় না। বিষয়টি দেখলে মনে হয়, তদন্ত কমিটিও এখানে সম্পৃক্ত—বানরের রুটি ভাগের মতো অবস্থা। এখানে তদন্ত কমিটির বিরুদ্ধেও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
সূত্র: জাগো নিউজ

