মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লম্ফিত করছে। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম বর্তমানে ব্যারেল প্রতি ১০৮.৭৭ ডলারে পৌঁছেছে। এটি ২০২০ সালের করোনা মহামারির পর এক দিনে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। মাত্র এক সপ্তাহে তেলের দাম প্রায় ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা চালাচ্ছে ইরানে, যার জবাবে ইরানও প্রতিশোধ দিচ্ছে। এই সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম মারাত্মকভাবে বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক বিমান হামলায় ইরানের একাধিক তেল ডিপো ধ্বংস হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য এটি জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
এই প্রভাব পড়ছে তেল আমদানিনির্ভর দেশের অর্থনীতিতে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য তেল আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ছে। ফলে সরকারের ভর্তুকি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের সূত্র জানিয়েছে, দেশে পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছে দেশি-বিদেশি কোম্পানির পাওনা ইতিমধ্যে ৪৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
যদি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজি’র দাম আরও বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি চাপ বাড়বে। শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নতুন সংকট সৃষ্টি হতে পারে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয়। যুদ্ধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি বন্ধ থাকায় বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ইরানে মার্কিন হামলার পর দাম ২৮ শতাংশ বেড়েছে, যা এশিয়ার বাজারেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত মূলত আমদানিনির্ভর। অপরিশোধিত তেলের প্রায় শতভাগই বিদেশ থেকে আসে, প্রধানত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। অন্যদিকে পরিশোধিত তেল আসে চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে। দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) এবং কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি মিলিয়ে বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করে। দেশের বার্ষিক চাহিদা আট থেকে সাড়ে আট লাখ টন। দেশীয় পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সরকারের কাছ থেকে নীতিগত সহায়তা পায়, তারা জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সংকটকালে দেশীয় কোম্পানিগুলোর আরও উৎসাহ ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত তীব্রতর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তেল পরিবহন আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
সোমবার এশিয়ান বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১৫.৫ শতাংশ বেড়ে ১০৭.১৬ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে নাইমেক্স লাইট সুইট ক্রুড ১৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ১০৬.৭৭ ডলারে লেনদেন হয়েছে। বিশেষ নজর কাড়া বিষয়, মাত্র এক মিনিটের মধ্যে দাম ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং পরের ১৫ মিনিটে আরও ১০ শতাংশ ওঠে।
কমোডিটি অনলাইনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৯ মার্চ সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ১০৮–১০৯ ডলারের মধ্যে লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় ১৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি। একইভাবে ডাবি-উটিআই ক্রুডের দামও ১০৮ ডলারের কাছাকাছি উঠেছে, যা ১৮–১৯ শতাংশ বেড়েছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
যদি হরমুজ প্রণালী মার্চের শেষ পর্যন্ত বন্ধ থাকে, তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলারের বেশি পৌঁছাতে পারে। এটি রেকর্ড স্তরের খুব কাছে এবং দীর্ঘায়িত হলে ১৯৭০-এর দশকের মতো জ্বালানি শকের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং উৎপাদন হ্রাসের মাধ্যমে পড়বে।
বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দেশে বছরে ৬–৭ মিলিয়ন টন জ্বালানি তেল আমদানি হয়, যার বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০ ডলার বাড়লেও আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। যদি দাম ১৫০ ডলারে ওঠে, তা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি করবে এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) লোকসানের মুখে পড়তে পারে, যদি না দাম সমন্বয় করা হয়।
বিদ্যুৎ খাতেও সংকট গভীর হবে। দেশের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র ফার্নেস অয়েলনির্ভর। তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, যার ফলে সরকারের ভর্তুকি আরও বাড়াতে হবে বা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করতে হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত অনুসারে ভর্তুকি কমানোর চাপ সরকারের সামনে কঠিন সিদ্ধান্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশে দেশে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম
ভিয়েতনামে ইতিমধ্যে ডিজেল ও পেট্রোলের দাম ২১ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। চীন, জাপান, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম লিটার প্রতি ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩২০ রুপিতে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এক সপ্তাহে পেট্রোলের দাম ১০ শতাংশ বেড়েছে, ইউরোপে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ছে, এবং অস্ট্রেলিয়ায় লিটার প্রতি দুই অস্ট্রেলিয়ান ডলারেরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এশিয়ার বড় তেল আমদানিকারক দেশগুলো বিকল্প উৎস খুঁজছে এবং মজুত বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল। যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, দেশ তিনটি বড় চাপের মুখে পড়বে—জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ভর্তুকির চাপ এবং মূল্যস্ফীতি। দেশে বছরে ৬–৭ মিলিয়ন টন জ্বালানি তেল আমদানি হয়, যার বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০ ডলার বাড়লেও আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রায় ৪,২০০ কোটি টাকার লাভ করেছে, যা ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ছিল ৩,৯০০ কোটি। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে বিপিসি লোকসানের মুখে পড়ে। ২০০৮ সালে দাম ১৪৭ ডলারে পৌঁছানোর সময় বিপিসিকে বড় ভর্তুকি দিতে হয়। ২০১১–২০১৪ সালেও দাম ১০০ ডলারের ওপরে থাকায় সরকার কয়েক দফা দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছিল।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও যুদ্ধের অনিশ্চয়তার কারণে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। সরকার তেল ব্যবহারে রেশনিং ব্যবস্থা চালু রেখেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশে দাম না বাড়ালে বিপিসি লোকসানে জ্বালানি বিক্রি করবে। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে এবং ভর্তুকি বাড়াতে হবে।
বিদ্যুৎ খাতেও সংকটের প্রভাব তীব্র। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ছিল ৬২ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৫–২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ৩৬ হাজার কোটিতে নামানো হয়েছে। এলএনজি খাতে ভর্তুকি ৯ হাজার কোটি থেকে কমে ৬ হাজার কোটি, তবে চলতি বছরে আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে। বিপিডিবির কাছে পাওনা ৪৬ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১৪ হাজার কোটি। সরকারি ও যৌথ মালিকানার কোম্পানির পুঞ্জীভূত লোকসান ৩০ হাজার কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, “বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, জ্বালানি নেই; বিপুল বকেয়ার মধ্যে এসে পড়েছি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে। সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সমাধানের পথ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।”
বিপিসির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, তেল আমদানির চুক্তি সাধারণত ছয় মাস মেয়াদি, আগামী জুন পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত। চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে তেল আসবে, যার সরাসরি প্রভাব ইরান সংকটের কারণে পড়ার কথা নয়। ফলে দেশজুড়ে তেলের মজুদ রয়েছে এবং তাৎক্ষণিক সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা কম।
বাংলাদেশ আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির আওতায় আছে। এর একটি শর্ত হলো জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানো এবং বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ। সরকার তাই মাসভিত্তিক দাম সমন্বয় পদ্ধতি চালু করেছে। তবে বাস্তবে এটি কার্যকর করা কঠিন। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, কৃষি এবং শিল্প খরচ বেড়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিদ্যুৎ খাতও চাপের মুখে। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র ফার্নেস অয়েলনির্ভর। তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়ে। সরকারকে তখন দুই বিকল্পের মধ্যে একটি নিতে হয়—দাম বাড়ানো বা ভর্তুকি বাড়ানো—দুই ক্ষেত্রেই বাজেটে চাপ বাড়ে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১৫০ ডলারেরও বেশি পৌঁছাতে পারে। এর ফলে তেল আমদানি বিল কয়েক বিলিয়ন ডলার বাড়বে। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ৭৬ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে, যা বাজেট ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতি বাড়াবে। পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে কৃষি ও শিল্প উৎপাদনও প্রভাবিত হবে। আইএমএফের শর্ত লঙ্ঘন হলে ঋণ কর্মসূচিও বিপন্ন হতে পারে। স্বল্পমেয়াদে বিকল্প সমাধান খুঁজে বের করা কঠিন। তাই মজুদ বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ জরুরি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম জানিয়েছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। প্রতিদিন প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি কমে গেলে শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে সরকার সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং চাহিদা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার জরুরি হলেও তা স্বল্পমেয়াদি সমাধান নয়।
ড. ইজাজ হোসেন বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। দুই সপ্তাহের মধ্যে সংঘাত শেষ না হলে দেশের সব ধরনের জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকট দেখা দিতে পারে এবং ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে।

