বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন ঋণনির্ভরতার ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসে বিনিয়োগ-ভিত্তিক কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা প্রফেসর রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, “সব প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করা উচিৎ নয়। কিছু প্রতিষ্ঠানকে শর্তসাপেক্ষে পুঁজিবাজার থেকে তহবিল উত্তোলনের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হতে পারে।
গতকাল ফার্স হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টসে অনুষ্ঠিত পুঁজিবাজার সাংবাদিক ফোরামের সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন। সেমিনারের বিষয় ছিল নতুন সরকারের অধীনে শেয়ারবাজারের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়। তিনি বলেন, “পুঁজিবাজার থেকে তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে সাধারণ মানুষও সরকারি এবং বেসরকারি খাতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারবে। এটি বিএনপির ঘোষিত লক্ষ্য পূরণের সঙ্গে খাপ খায়, যা ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে মালিকানাভিত্তিক অর্থনীতিতে স্থানান্তরের প্রতিশ্রুতি বহন করে।”
তিনি জানান, আগামী জাতীয় বাজেটে এ বিষয়ে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তিনি আরও বলেন, অর্থনীতিকে কেবল ভোগ্যপণ্যভিত্তিক ও ঋণনির্ভর মডেল থেকে বের করে বিনিয়োগভিত্তিক কাঠামোর দিকে স্থানান্তর করতে হবে। বিনিয়োগভিত্তিক কাঠামো ছাড়া অর্থনীতি টেকসই হওয়া সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে পুঁজিবাজার দেশের মোট জিডিপির মাত্র ১২ শতাংশ, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় খুবই কম। নতুন সরকার এই অবস্থা উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়—বাজারকে গভীর ও বিস্তৃত করা হবে। আমাদের লক্ষ্য, সীমান্তবাজার থেকে উদীয়মান বাজারে উত্তরণ,” বলেন তিতুমীর।
তিনি ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের কারণ হিসেবে সংক্ষিপ্ত-মেয়াদি আমানত এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণের অসঙ্গতি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “সুতরাং, নির্ধারণ করতে হবে কোন প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণ পাবে, কতদিনের জন্য এবং কত পরিমাণে। আর কোন প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজার থেকে তহবিল সংগ্রহ করতে হবে।” সরকার ভবিষ্যতে উন্নয়নমূলক ব্যয় পূরণের জন্য বন্ড বা শেয়ারের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনাও ভাবছে। তিতুমীর প্রশ্ন তোলেন, “আমরা কেন করদাতাদের টাকায় বিমান কিনব?
তিনি আরও বলেন, দেশে একটি ইসলামিক শেয়ারবাজার থাকা উচিত, যেখানে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং গালফ দেশগুলোর বিনিয়োগকারীরা অংশগ্রহণ করতে পারবে। এছাড়াও, প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এই বিনিয়োগে যুক্ত হতে পারবে।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, অডিটর এবং ক্রেডিট রেটিং সংস্থার কাজেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, বলেছে খন্দকার রাশেদ মাকসুদ, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান। মাকসুদ জানান, গত ১৮ মাসে বিভিন্ন আইনগত সংস্কার কার্যকর হয়েছে। বাজারে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে তদন্তের পর জরিমানা প্রয়োগ করা হয়েছে, যার মোট পরিমাণ ১,৪৮৮ কোটি টাকা, তবে এ পর্যন্ত আদায় হয়েছে মাত্র ৫.২৩ কোটি টাকা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এক বা দুই বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ টাকা রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হবে। তিনি আরও জানান, কমিশন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যৌথভাবে নীতিমালা প্রণয়ন করছে, যা শিগগিরই চূড়ান্ত হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মোঃ আবদুর রহমান খান বলেন, “শুধু করপ্রণোদনা বাজারকে সুস্থ রাখতে যথেষ্ট নয়। অতীতে করপ্রণোদনা থাকলেও শেয়ারবাজারের উত্থান-পতন ঠেকানো যায়নি।” তিনি আরও বলেন, “যেসব কোম্পানি ডিভিডেন্ড দিতে অক্ষম, তাদের ভবিষ্যতে তালিকাভুক্ত করা উচিত নয়। কোনো কোম্পানি ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে বাজারে প্রবেশ করতে পারবে না।”
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, “ভাল কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও অনেকেই পুঁজিবাজারে প্রবেশে দ্বিধা করছে। এক কারণ হলো, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো সঠিকভাবে ভ্যাট প্রদান করে, কিন্তু অনিয়মী কোম্পানিগুলো এড়িয়ে যায়, যা অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে।”
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মোমিনুল ইসলাম বলেন, “বিগত পনেরো বছরে সরকার পুঁজিবাজারকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়নি। তবে নতুন সরকার এই খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছে।” বেসরকারি তালিকাভুক্ত কোম্পানির সমিতির সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ বলেন, “পুঁজিবাজারের সব স্তরে ডিজিটাল প্রক্রিয়া চালু করা জরুরি, যাতে নথি ও বিবরণ অনলাইনে জমা দেওয়া যায়। এছাড়াও, অতিরিক্ত তালিকাভুক্তির ফি নতুন শেয়ারপ্রদানের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে।”
বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং দালাল সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, “গত দুই বছরে কোনো নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে প্রবেশ করেনি। এখন নতুন শেয়ারপ্রদানের সময়। ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনতে উৎসাহিত করা উচিত।

