দেশের অন্যতম ব্যস্ত স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টম হাউসে চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব আদায়ে বড় ধাক্কা লেগেছে। অর্থবছরের প্রথম আট মাসে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা।
যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরকে ঘিরে প্রতি বছরই হাজার হাজার কোটি টাকার আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালিত হয়। দেশের রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ আসে এই বন্দর থেকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নো-এন্ট্রি পণ্য খালাস, মিথ্যা ঘোষণায় চালান পার করে দেওয়া, শুল্ক ফাঁকি এবং নজরদারির দুর্বলতার অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। এতে বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, দুর্বল তদারকি এবং অসাধু কর্মকর্তা–কর্মচারীদের যোগসাজশে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই চক্রের কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। কিন্তু এসব ঘটনায় কার্যকর তদন্ত কিংবা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির খুব কম বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ৬৮ হাজার ৮৬টি ট্রাকে মোট ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৫২১ দশমিক ৮৪ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি ও রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে আমদানি হয়েছে ১১ লাখ ১০ হাজার ৯০৩ দশমিক ৮১ মেট্রিক টন এবং রপ্তানি হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৬১৮ দশমিক ৬১ মেট্রিক টন পণ্য।
এর আগের ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩৩৬টি ট্রাকে মোট ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৮০ দশমিক ৬৯ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি–রপ্তানি হয়। এর মধ্যে আমদানি ছিল ২০ লাখ ১১ হাজার ২৬৭ দশমিক ৫৯ মেট্রিক টন এবং রপ্তানি ছিল ৪ লাখ ২১ হাজার ৭১৩ মেট্রিক টন।
কাস্টমস ও বন্দর সূত্র জানায়, গত ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের কিছুটা শীতলতা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এসব কারণে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে গতি কমে গেছে।
আগে যেখানে বেনাপোল বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ পণ্যবাহী ট্রাক আমদানি হতো, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাকে। একইভাবে আগে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ ট্রাক পণ্য রপ্তানি হলেও এখন তা কমে প্রায় ১৫০ ট্রাকে নেমে এসেছে। আমদানি ও রপ্তানির এই পতনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ে।
বাণিজ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানি বাণিজ্যের স্থবিরতা, ৫ আগস্টের পর ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং বন্দরের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম—এই তিনটি কারণ মিলেই বেনাপোল কাস্টম হাউসে রাজস্ব সংকট আরও গভীর হয়েছে। তাদের দাবি, গত এক দশকে ছয় মাসে এত বড় রাজস্ব ঘাটতি খুব কমই দেখা গেছে।
আমদানিকারক আল মামুন বলেন, ব্যবসায়ীরা নিয়ম মেনে বাণিজ্য করতে চান। তবে নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নত হলে ব্যবসা–বাণিজ্যের পরিবেশ আরও ভালো হবে বলে তিনি আশা করেন।
বেনাপোল বন্দরের আমদানি–রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আলহাজ মহসিন মিলন বলেন, আগে প্রতিদিন ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ ট্রাক পণ্য আমদানি হতো। এখন তা কমে ২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাকে নেমেছে। একইভাবে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ ট্রাক পণ্য রপ্তানি হলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ১৫০ ট্রাকে দাঁড়িয়েছে। আমদানি–রপ্তানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আয়ও কমে গেছে।
বেনাপোল কাস্টম হাউসের রাজস্ব কর্মকর্তা মনিবুর রহমান বলেন, বন্দরে আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়েও প্রভাব পড়েছে। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা, দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে কাজ চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আমদানি–রপ্তানি বাড়লে জুনের মধ্যে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আনা, কম মূল্যে পণ্যের মূল্য দেখানো, বেশি শুল্কের পণ্যকে কম শুল্কের নামে আমদানি করা এবং ঘুষের বিনিময়ে শুল্ক কমিয়ে দেওয়ার মতো অনিয়মও রাজস্ব ঘাটতির বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কিছু অসাধু কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে আমদানিকারকদের উচ্চ শুল্কের ভয় দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি করেন। পরে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে শুল্ক কমিয়ে দেওয়ার নামে বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়। এতে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি সৎ ব্যবসায়ীরাও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।

