আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনকে সামনে রেখে সংস্কার কাজের বড় অংশ শেষ হয়েছে জাতীয় সংসদ ভবনে। ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটিকে আবার কার্যকর অবস্থায় আনতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। আগামী ১২ মার্চ শুরু হতে যাওয়া অধিবেশন আয়োজনের জন্য ইতোমধ্যে ভবনটি মোটামুটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র- শ্রমিক- জনতার আন্দোলনের মুখে সরকার পতনের দিন কয়েক হাজার মানুষ সংসদ ভবনে প্রবেশ করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এতে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ ও হুইপদের কক্ষসহ নয়তলা ভবনের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংসদ এলাকার মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের কার্যালয়, সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের অফিস এবং বিভিন্ন আবাসিক ভবনও তছনছ করা হয়।
সেসময় লুটপাটকারীরা নগদ অর্থের পাশাপাশি কম্পিউটার, এসি, আসবাবপত্র, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন যন্ত্রাংশ এবং সাউন্ড সিস্টেম খুলে নিয়ে যায়। এমনকি বাথরুমের সাধারণ সামগ্রীও সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। সংসদ লাইব্রেরিতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয় এবং অগ্নিকাণ্ডে হাজার হাজার বই পুড়ে যায়।
এই ঘটনার পর সংসদ সচিবালয়ের কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। পরে ভবনটি আবার ব্যবহারযোগ্য করতে দ্রুত সংস্কার কাজ শুরু করা হয়। সংসদ সচিবালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ২৯৭ কোটি টাকার মতো ব্যয় করে বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামত করা হয়েছে।
সংসদ সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে আগেই জানানো হয়েছিল, ওইদিনের ঘটনায় দাফতরিক ও ব্যক্তিগত মিলিয়ে প্রায় ৯০ লাখ টাকা নগদ অর্থও হারিয়ে যায়। পরে সংসদ ভবন, এমপি ভবন, বিভিন্ন হোস্টেল এবং আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা জোরদারে তিনটি কমিটি গঠন করা হয়। এসব কমিটি ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো পরিদর্শন করে উদ্ধার হওয়া সামগ্রী নির্দিষ্ট স্থানে জমা দেয়।
গণপূর্ত বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সংসদ ভবনের বিভিন্ন ব্লকের প্রধান সার্ভিস লাইন, সুইচ, সকেট, এলইডি লাইট, টিউবলাইট এবং সার্কিট ব্রেকার মেরামতে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ভবনের অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক লাইনের পাশাপাশি রাস্তা, গেট, লেক ও নিরাপত্তা বাতিরও সংস্কার করা হয়েছে। এ ছাড়া সচিব হোস্টেল, মেডিক্যাল সেন্টার, মিডিয়া সেন্টার, টিভি স্টুডিও এবং ব্যাংকের সার্ভিস লাইনের বৈদ্যুতিক কাজেও উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। বিভিন্ন বাসভবন ও কর্মচারী কোয়ার্টারের ক্ষতিগ্রস্ত বৈদ্যুতিক স্থাপনাও নতুন করে মেরামত করা হয়েছে।
সংসদ ভবনের ভেতরের এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থা, লিফট, সিসিটিভি এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম মেরামতেও বড় অঙ্কের অর্থ খরচ হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসি ও অন্যান্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র মেরামত ও প্রতিস্থাপনের জন্যই সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, শপথ গ্রহণের দিন তিনি সংসদ ভবনে গিয়ে দেখেছেন যে সেখানে ব্যাপক সংস্কার কাজ করা হয়েছে। তাঁর মতে, আগে যে ধরনের ভাঙচুর হয়েছিল তার চিহ্ন এখনও কিছু জায়গায় বোঝা গেলেও বেশিরভাগ অংশ পুনর্গঠন করা হয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ঘটনার পরপরই ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। সেই অনুযায়ী অর্থ পাওয়া গেছে এবং সংস্কার কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। সব কাজ শেষ হলে মোট ব্যয়ের চূড়ান্ত হিসাব জানানো যাবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, সংসদ ভবনের সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংসদ সচিবালয়ের নিজস্ব বাজেট থেকে দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত অর্থও বরাদ্দ দেওয়া হবে।
সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা জানিয়েছেন, অধিবেশন কক্ষসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর মেরামত প্রায় শেষ হয়েছে। অল্প কিছু কাজ বাকি থাকলেও খুব দ্রুত তা শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, নির্ধারিত সময়েই সংসদের অধিবেশন শুরু করার মতো প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

