প্রায় দেড় বছর স্থিতিশীল থাকার পর হঠাৎ করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে ডলারের দর বাড়তে শুরু করেছে। ব্যাংকগুলো এতদিন বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ২৫ থেকে ৩৫ পয়সা দরে কিনছিল। তবে গতকাল সেই দাম এক লাফে প্রায় ৫৫ পয়সা পর্যন্ত বেড়ে সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৯০ পয়সায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে আন্তঃব্যাংক বাজার ও খোলাবাজারেও ডলারের দর ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের মতে, আগাম এলসি দায় পরিশোধের চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ডলারের বাজারে এই চাপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছে ১২২ টাকা ৫৫ পয়সায়। আগের দিন এ দর ছিল ১২২ টাকা ৩৭ পয়সা। এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দর ১২২ টাকা ৩০ থেকে ৪০ পয়সার মধ্যে ওঠানামা করছিল।
অন্যদিকে খোলাবাজারেও নগদ ডলারের দাম বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে ১২৫ টাকা ৭০ থেকে ৮০ পয়সায়। গত সপ্তাহে এই দর ছিল ১২৪ টাকা ৫০ থেকে ৬০ পয়সা। ইরানকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই খোলাবাজারে ডলারের দর বাড়তে থাকে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ডলারের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ে এবং এর প্রভাবে পণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতিও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এ বিষয়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সামনে ব্যাংকগুলোকে অনেক ধরনের আন্তর্জাতিক পরিশোধ সম্পন্ন করতে হবে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে এসব পেমেন্ট শেষ করার চাপ রয়েছে। ঈদের আগে ব্যাংক বন্ধ হওয়ার সময় মাথায় রেখে অনেক ব্যাংক এখন প্রয়োজনীয় ডলার ধরে রাখছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেখানে কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে ডলারের দরে এই হঠাৎ বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী সপ্তাহ থেকে দেশে টানা সাত দিন ঈদের ছুটি থাকবে। নিয়ম অনুযায়ী, ওই সময়ের এলসি দায় বন্ধের আগেই পরিশোধ করতে হয়। এতে এখনই ডলারের চাহিদা বাড়ছে।
এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার প্রভাবও পড়ছে রেমিট্যান্স প্রবাহে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরানসহ আশপাশের বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠেছে। ফলে বাংলাদেশি অধ্যুষিত কিছু অঞ্চলে শিল্পকারখানা ও ব্যাংক শাখা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। এসব এলাকা থেকে স্বাভাবিকভাবে রেমিট্যান্স পাঠানো ব্যাহত হচ্ছে।
তবে সামগ্রিকভাবে রেমিট্যান্স প্রবাহ এখনও শক্তিশালী রয়েছে। রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে এবং সম্ভাব্য অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় অনেক প্রবাসী নিজেদের সঞ্চিত অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন। এ কারণেই রেমিট্যান্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাও বাজারে কাজ করছে।
২০২১ সালের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে দেশে ডলারের দর প্রায় ৮৪ টাকায় স্থিতিশীল ছিল। পরে করোনা মহামারি এবং রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ তৈরি হয়। সেই সময় ধীরে ধীরে ডলারের দর বেড়ে ১২২ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থ পাচার রোধে কড়াকড়ি এবং হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ে। আমদানি ৫ শতাংশ বাড়লেও রপ্তানি ১ শতাংশ কমেছে। তবু উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে এতদিন ডলার বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি মার্চ মাসের প্রথম সাত দিনে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রায় ১০৭ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ২৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার বেশি। শতাংশের হিসেবে এই প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩৭ দশমিক ৯৪।
চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স এসেছে দুই হাজার ৩৫২ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল এক হাজার ৯২৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৪২৬ কোটি ডলার, যা প্রায় ২২ দশমিক ১১ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরেও রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রায় ২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল। মূলত এই শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণেই এতদিন ডলারের বাজারে বড় অস্থিরতা দেখা যায়নি।
ব্যাংকাররা জানান, সোমবার দিনের শুরুতে বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৪০ থেকে ৪৫ পয়সা দরে বিক্রি করছিল। তবে দুপুরের পর সেই দর বেড়ে ১২২ টাকা ৮০ পয়সায় ওঠে। কিছু সংকটাপন্ন ব্যাংক রেমিট্যান্স সংগ্রহে ১২৩ টাকা পর্যন্ত দাম দিয়েছে।
ব্যাংকারদের মতে, ডলারের দর যদি ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে তা মূল্যস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বেসরকারি একটি ব্যাংকের আন্তর্জাতিক বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাজারে যদি এই ধারণা ছড়িয়ে পড়ে যে ডলারের দাম বাড়বে, তাহলে বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো ডলার ধরে রেখে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এমন চেষ্টা দেখা গিয়েছিল। তবে সে সময় তৎকালীন গভর্নরের কঠোর অবস্থানের কারণে তা সফল হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করেনি। বরং রিজার্ভে উল্টো ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গ্রস হিসাবে দাঁড়ায় ৩৫ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার। বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল ৩০ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। তবে রোববার এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) দায় পরিশোধের পর রিজার্ভ কমে গ্রস হিসাবে ৩৪ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।

