দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে দেশটির অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা পাঁচটি মূল সুপারিশ দিয়েছেন। তারা বলেন, সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রত্যাহার করা, সুদহার কমানো, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি সহজ করা, সরবরাহ ও বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা অত্যন্ত জরুরি।
এছাড়া, স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগকে ত্বরান্বিত করতে ব্যবসা পরিচালন ব্যয় হ্রাস এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করার পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা পরিবেশ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বক্তারা টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং শিল্প-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও অনশোর ও অফশোর অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানান।
সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) মিলনায়তনে গতকাল সোমবার। এতে বক্তারা বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। বক্তারা বলেন, সম্প্রতি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা দেশের বেসরকারি খাতের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, “আমাদের শিল্প খাতের জ্বালানি আমদানি নির্ভর, তাই বৈশ্বিক সংঘাতের প্রভাব সরাসরি খাতের অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। মার্কিন শুল্ক নীতি স্থানীয় ও বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।” তিনি আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে গেছে, তাই রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজীকরণের পাশাপাশি খাতভিত্তিক পরিকল্পনা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মঞ্জুর হোসেন বলেন, “২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে হলে উৎপাদনশীল খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে এসএমইদের অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধুমাত্র ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন বলেন, “বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি না নিলে মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ বা হঠাৎ সুদের হার হ্রাস করা উচিত নয়।”
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার বলেন, “সরকার আয়ের জন্য শুল্কের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা কমাতে হবে। স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক ও যৌক্তিক হওয়া প্রয়োজন। এনবিআরের কর কাঠামো সংস্কার এবং পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা জরুরি।”
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, “সরকার নির্বাচনী ইশতেহারের সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর নীতি প্রণয়নে কাজ করছে। বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিবেশ সুরক্ষা ও দক্ষ জনবল তৈরির ওপর জোর থাকবে।”
অনুষ্ঠানের আলোচনায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, কৃষি খাতে বাণিজ্যিকীকরণ দ্রুত বাড়ছে। তবে চাল উৎপাদন লাভজনক না হওয়ায় কৃষকের হতাশা বাড়ছে। বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থাও কার্যকর নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, “পরিস্থিতি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে আনতে বাজেট, মুদ্রানীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দিতে হবে।” অনুষ্ঠানে ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহসভাপতি মো. সালিম সোলায়মানসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।

