দেশে চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) স্পট মার্কেট থেকে ডিজেল কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনাও সম্পন্ন হয়েছে। বিপিসি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই ক্রয় সম্পন্ন করা হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান সংঘাত জ্বালানি নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান ও অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। এতে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরানের জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে মিসাইল ও ড্রোন হামলা হয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক চতুর্থাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও এলপিজির বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ইরাক ও ইরানসহ প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো এই প্রণালির মাধ্যমে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ করে। দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে চলে।
বিপিসির পরিচালক (অর্থ, অপারেশন ও পরিকল্পনা) নাজনীন পারভীন বলেন, “আমরা সাধারণত আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে পরিশোধিত জ্বালানি তেল সংগ্রহ করি। কিন্তু সংকটকালীন মুহূর্তে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে স্পট মার্কেট থেকে দুই লাখ টন ডিজেল কেনার প্রক্রিয়া চলছে। এই কাজ ইতোমধ্যে ৯৫ শতাংশ এগিয়ে এসেছে।”
চলতি সপ্তাহে উত্তেজনার কারণে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করলে তেলের দামে প্রভাব পড়েছে। জলপথ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও এলপিজির চাহিদার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
যদিও বিপিসি জানায়, বাংলাদেশে আমদানি করা অধিকাংশ পরিশোধিত তেল আসে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও চায়না থেকে। এসব দেশে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হয় না। তবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা ক্রুড অয়েলের পুরো চালান হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে আসে। বর্তমানে নর্ডিক পোলাক নামের একটি ট্যাংকার ভ্যাসেল সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল লোড করতে আটকে রয়েছে।
আরও একটি ট্যাংকার ‘ওমেরা গ্যালাক্সি’ আগামী ২২ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল দানা বা ফুজাইরা থেকে এক লাখ টন অ্যারাবিয়ান লাইড ক্রুড লোডের জন্য যাচ্ছে। তবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে জাহাজ মালিকরা জাহাজ পাঠাতে অনিচ্ছুক।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছে। দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কায় যানবাহন চালক ও ডিস্ট্রিবিউটররা জ্বালানি মজুত করছেন। এর ফলে বিপিসির বিপণন কেন্দ্রগুলোতে ডিজেল ও অকটেনের মজুত দ্রুত কমছে। এজন্য সরবরাহ চেইন সচল রাখতে স্পট মার্কেট থেকে ডিজেল কেনার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, বিপিসি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ‘এনার্জি অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এলএলসি’ থেকে স্পট মার্কেটে দুই লাখ টন ডিজেল কিনছে। প্রতিষ্ঠানটির স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে রয়েছে মেঘনা গ্রুপ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরাসরি আলোচনায় যুক্ত আছেন। প্রতিষ্ঠানটি সম্ভবত কাজাখস্তান থেকে ডিজেল সরবরাহ করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫ হাজার টনের আটটি পার্সেলে ডিজেল দেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, “লোকাল এজেন্টের মাধ্যমে কোটেশন নেওয়া হয়েছে। পর্যালোচনা শেষে ক্রয় কমিটিতে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিলে দ্রুত সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হবে।”
নাজনীন পারভীন বলেন, “স্পট মার্কেট থেকে কেনা হলেও এ ডিজেল কিনতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে না। আমাদের বর্তমান সরবরাহকারীদের কাছ থেকে নির্ধারিত রেটের কাছাকাছি মূল্যেই দুই লাখ টন ডিজেল কেনা হবে।”

