মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব এখন দেশের নির্মাণসামগ্রীর বাজারেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রডের বাজারে দেখা গেছে দ্রুত মূল্যবৃদ্ধি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত বড় ব্র্যান্ডের রডের দাম প্রায় ১১ থেকে ১২ শতাংশ বেড়েছে। ফলে বর্তমানে বাজারে টনপ্রতি রডের দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০ হাজার থেকে ৯৪ হাজার টাকার মধ্যে।
রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, কাঁচামালের আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়াই এই দাম বাড়ার মূল কারণ। বিশ্ববাজারে রড তৈরির প্রধান কাঁচামাল লোহার স্ক্র্যাপ আমদানির খরচ টনপ্রতি প্রায় ৫০ ডলার বা প্রায় ছয় হাজার টাকা বেড়েছে। যদিও নতুন দামে কেনা স্ক্র্যাপ এখনো দেশে এসে পৌঁছায়নি। তবে এর প্রভাব ইতোমধ্যে পড়েছে দেশের জাহাজভাঙা শিল্প থেকে পাওয়া স্ক্র্যাপের দামে। এই খাতের স্ক্র্যাপের দাম টনপ্রতি প্রায় তিন হাজার টাকা বেড়ে এখন প্রায় ৫৭ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
দেশের বাজারে রডের বড় চারটি ব্র্যান্ড হলো বিএসআরএম, আবুল খায়ের স্টিল (একেএস), জিপিএইচ এবং কেএসআরএম। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর আগে এসব ব্র্যান্ডের রডের দাম ছিল টনপ্রতি প্রায় ৮১ হাজার থেকে ৮৪ হাজার টাকার মধ্যে। বর্তমানে সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার থেকে ৯৪ হাজার ৫০০ টাকায়।
ব্র্যান্ডভেদে দামের পার্থক্যও রয়েছে। বিএসআরএমের রড এখন বিক্রি হচ্ছে টনপ্রতি প্রায় ৯৪ হাজার ৫০০ টাকায়, যা আগে ছিল ৮৪ হাজার ৫০০ টাকা। আবুল খায়ের স্টিলের রডের দাম ৮৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৩ হাজার টাকায়। জিপিএইচের রডের দাম ৮২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ৯২ হাজার টাকা। আর কেএসআরএমের রড ৮১ হাজার টাকা থেকে বেড়ে এখন প্রায় ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
শুধু বড় ব্র্যান্ডই নয়, মাঝারি ব্র্যান্ডের রডের দামও একইভাবে বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে এইচএম স্টিলের রডের দাম টনপ্রতি ৭৯ হাজার টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৮৯ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
চট্টগ্রামের হালিশহরে অবস্থিত একটি রড কোম্পানির ডিলার আরএম এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার মহিদুল মাওলা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই বাজারে রডের দাম বাড়তে থাকে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত প্রায় ১০ দিনে বড় ব্র্যান্ডগুলোর রডের দাম টনপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
কাঁচামালের আমদানিতে ধীরগতি
দেশে রড উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় স্ক্র্যাপ বা পুরোনো লোহার টুকরার প্রায় ৯৩ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। বাকি প্রায় ৭ শতাংশ আসে দেশের জাহাজভাঙা শিল্প থেকে। ২০২৫ সালে দেশে মোট প্রায় ৫৩ লাখ টন স্ক্র্যাপ আমদানি হয়েছে। সে হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৪ লাখ ৪৪ হাজার টন স্ক্র্যাপ আমদানির কথা।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় আমদানির পরিমাণও কমেছে। গত বছরের অক্টোবর মাসে স্ক্র্যাপ আমদানি হয়েছিল প্রায় ৫ লাখ ১০ হাজার টন। নভেম্বর মাসে তা কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৯০ হাজার টনে। ডিসেম্বর মাসে কিছুটা বেড়ে হয় ৪ লাখ ৪১ হাজার টন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে আমদানি হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ১৩ হাজার টন এবং ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে প্রায় ৩ লাখ ২৪ হাজার টনে, যা গত এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, আমদানি কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের হাতে পর্যাপ্ত কাঁচামাল নেই। একই সঙ্গে প্রস্তুত রডের মজুতও সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন করে কাঁচামাল আমদানিতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের দামও বাড়তে শুরু করেছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আগে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে জাহাজভাড়াসহ স্ক্র্যাপের দাম ছিল টনপ্রতি প্রায় ৩৬০ মার্কিন ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৪১০ ডলারে পৌঁছেছে।
স্ক্র্যাপ রপ্তানিকারক সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জাগুয়ার রিসোর্সেস অ্যান্ড ক্যাপিটালের কান্ট্রি হেড ইফতেখার আহমেদ জানান, যুদ্ধ শুরুর আগেই স্ক্র্যাপের দামে কিছুটা ঊর্ধ্বগতি ছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর জাহাজভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ফলে নতুন সরবরাহ চুক্তিগুলো এখন নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং জিপিএইচ ইস্পাতের চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাজারে চাহিদা কম থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান এত দিন উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে রড বিক্রি করেছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, জাহাজভাড়া এবং স্ক্র্যাপের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি ডলারের দাম বাড়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। এই বাড়তি ব্যয় সামাল দিতেই রডের দাম সমন্বয় করতে হয়েছে।

