দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে বিদেশে চলে যাওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম কতদূর এগিয়েছে—তা জানতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। বৈঠকে পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত ও ফেরত আনার উদ্যোগ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের প্রায় ৪০টি ব্যাংকের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অধিকাংশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ খুঁজে বের করা এবং তা দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যাংকগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে—সেই অগ্রগতি জানতে চান গভর্নর। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান এবং আইনি সংস্থার সঙ্গে ব্যাংকগুলোর সম্ভাব্য সহযোগিতা বা চুক্তির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান বলেন, মূলতঃ পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করতেই এই সভা ডাকা হয়। নতুন গভর্নর ব্যাংকগুলোর সার্বিক প্রস্তুতি ও উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চান। তিনি জানান, ইসলামী ব্যাংক ইতোমধ্যে দু’টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ) স্বাক্ষর করেছে।
এর আগে গত বছরের অক্টোবরে তৎকালীন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এমডিদের সঙ্গে বৈঠক করে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে উদ্যোগ নিতে নির্দেশনা দেন। সে সময় ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান ও আইন সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কয়েকটি ব্যাংক ইতোমধ্যে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা করেছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বৈঠকের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে। গভর্নর জানিয়েছেন, ব্যাংক থেকে চুরি বা পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত ও ফিরিয়ে আনার জন্য গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই টাস্কফোর্সের পরামর্শকদের সঙ্গে বৈঠক করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। সর্বশেষ বৈঠকের শুরুতেও টাস্কফোর্সের পরামর্শক ফারহানুল গণি চৌধুরী সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি উপস্থাপনা দেন।
অর্থ পাচারের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই দেশের আর্থিক খাতে বড় উদ্বেগের কারণ। বিভিন্ন অভিযোগ অনুযায়ী, বিগত দেড় দশকে ব্যাংক খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বেরিয়ে গেছে। এসব ঋণের বড় অংশ পরে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ফলে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক সময় প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের পরবর্তী প্রায় ১৫ বছরে বিভিন্ন পদ্ধতিতে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। প্রতি ডলার ১২০ টাকা ধরে যার পরিমাণ প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকার সমান। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে চলে গেছে।

