মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সারা বিশ্বের তেল ও গ্যাসের বাজারকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম সর্বকালের উচ্চতায় পৌঁছেছে, আর তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। তবে দেশবাসী সংকটকে বুঝে সাশ্রয়ী ব্যবহার না করে বরং তেল বেশি কিনে মজুত করার দিকে ঝুঁকছে। চলতি মাসে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের বিক্রি গত মাসের প্রথম সপ্তাহের তুলনায় ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশ সরকারও দেশে দাম বাড়াবে—এই ভ্রান্ত ধারণা থেকেই ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটর এবং ব্যবহারকারীরাও কৃত্রিম মজুতের দিকে ঝুঁকেছে। বিপিসি এটিকে প্যানিক বলেছে এবং আশা করা হচ্ছে, প্যানিক কাটলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। জ্বালানি সরবরাহ ঠিক রাখার জন্য সরকার ইতিমধ্যেই সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। গত দুদিনে তিনটি জাহাজে ৮৫ হাজার টন ডিজেল চট্টগ্রামে এসেছে, যার মধ্যে একটি খালাস হয়েছে। বাকি দুটি জাহাজ খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে।
পাম্পের সরেজমিন দৃশ্য
চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, গত শুক্রবার (৬ মার্চ) বিকেল থেকে পেট্রোল পাম্পে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের দীর্ঘ লাইন। মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সকালেও নগরীর প্রায় সব পাম্পে ছিল ব্যাপক ভিড়। অনেকেই ড্রামে করে ডিজেল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
লালদীঘি পাড়ের মো. সিরাজুল হক অ্যান্ড সন্স পেট্রোল পাম্পে দেখা যায়, মানুষ পানির বোতল, লুব্রিকেন্টের ব্যবহৃত বোতল ও ড্রামে ডিজেল সংগ্রহ করছেন। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও বিমা অফিসের কর্মীরাও বড় পরিমাণে তেল মজুত করছেন। একজন কর্মচারী বলেন, “পুলিশ প্লাজার জেনারেটরের জন্য এসব তেল দেওয়া হচ্ছে।”
অনেকে জানাচ্ছেন, তারা মার্কেট ও বাসাবাড়ির জেনারেটর চালানোর জন্য এক লিটার থেকে ৪০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল কিনছেন। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বাইকপ্রতি দুই লিটার অকটেন দেওয়ার নিয়ম থাকলেও, অনেক পাম্পে মোটরসাইকেলে ২০০ টাকার অকটেন বিক্রি হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে। কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল এ জলপথকে বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয়। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক চতুর্থাংশ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এই প্রণালির মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ইরাক ও ইরানসহ প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলো এই জলপথ ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ করে। দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেলের অপরিশোধিত তেল এই প্রণালির মধ্য দিয়ে যায়।
চলতি সপ্তাহে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনার কারণে ইরান যদি এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে, তা বিশ্ববাজারে তেলের দামে প্রভাব ফেলবে। হরমুজ প্রণালির সম্ভাব্য বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই বাংলাদেশে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও এলপিজি নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
সংকটে বিক্রি বেড়েছে, চাহিদাও বৃদ্ধি
চলতি মার্চ মাসের প্রথম ৮ দিনে দেশে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৫৭ টন, অকটেন ১২ হাজার ৩০৮ টন এবং পেট্রোল ১৩ হাজার ৪৭৩ টন। এর আগে ২০২৫ সালের মার্চের প্রথম ৮ দিনে যথাক্রমে বিক্রি হয়েছিল ৯৮ হাজার ৮৪২ টন, ৮ হাজার ৯৯৩ টন এবং ১১ হাজার ১০৫ টন। এর অর্থ, এক বছরের ব্যবধানে ডিজেলের বিক্রি বেড়েছে ৩৫.৩২%, অকটেন ৩৬.৮৬% এবং পেট্রোল ২১.৩২%।
গত ফেব্রুয়ারির প্রথম ৮ দিনে বিপিসি ১ লাখ ১৯ হাজার ৭৬০ টন ডিজেল, ১০ হাজার ৯৪৭ টন অকটেন এবং ১১ হাজার ৪৮৬ টন পেট্রোল বিক্রি করেছিল। মার্চের প্রথম ৮ দিনের বিক্রি সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, মাসের ব্যবধানে অকটেন ১২.৪৩%, পেট্রোল ১৮.১৫% এবং ডিজেল ১১.৬৯% বেড়েছে।
দেশের জ্বালানি চাহিদা ও সরবরাহ
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে জ্বালানি তেলের ৯২% আমদানি করতে হয়। অবশিষ্ট ৮% স্থানীয় উৎস থেকে আসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি দেশে ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি সরবরাহ করেছে। ব্যবহৃত তেলের মধ্যে ৬২.৬৯% ডিজেল, ১৪.৩৪% ফার্নেস অয়েল, ৬.৩২% পেট্রোল, ৫.৯০% অকটেন, ১% কেরোসিন, ৮.১৯% জেটএ-১ এবং ১.৫৬% অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য।
ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রতি মাসে গড়ে ৫০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করে এবং ১৫ হাজার টন পেট্রোল উৎপাদন করে বিপিসিতে সরবরাহ করে। ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত বলেন, “আমরা নিয়মিত বাজার চাহিদা পূরণে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করছি।”
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি মোট ৪ লাখ ১৫ হাজার ৬৫৩ টন অকটেন, ৪ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৫ টন পেট্রোল এবং ৪৩ লাখ ৫০ হাজার ৭৫ টন ডিজেল বিক্রি করেছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টন পেট্রোল ও অকটেন আসে সরকারি গ্যাসক্ষেত্র ও বেসরকারি ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট থেকে।
চলতি (মার্চ) মাসে মোট চাহিদা
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি মার্চ মাসের প্রথম ৮ দিনে দৈনিক গড়ে ১৬,৭২০ টন ডিজেল, ১,৫৩৯ টন অকটেন এবং ১,৬৮৪ টন পেট্রোল বিক্রি হয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী, পুরো মার্চ মাসে দেশের চাহিদা দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৫ লাখ টন ডিজেল, সাড়ে ৪ হাজার টন অকটেন এবং ৫ হাজার টনের বেশি পেট্রোল।
বিপিসির সদ্য অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কুদরত-এ ইলাহি বলেন, “বর্তমানে মানুষ গুজবে ভেসে যাচ্ছে। যেভাবে কৃত্রিম মজুতের চেষ্টা চলছে, তাতে সপ্তাহে পাঁচ জাহাজ তেল এনেও পরিস্থিতি সামলানো যাবে না।”
বর্তমানে মজুত
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ৯ মার্চ মেইন ইনস্টলেশন পয়েন্ট ও ডিপোগুলোতে মোট মজুত ছিল—ডিজেল ১ লাখ ৩৪ হাজার টন, অকটেন ২৪,৯৯৬ টন, পেট্রোল ২০,৪৯০ টন, কেরোসিন ১৩,৮৪৯ টন, ফার্নেস অয়েল ৬৮,৩২০ টন, জেট ফুয়েল ১৮,০৫০ টন এবং মেরিন ফুয়েল ৪,৯০৯ টন। এর মধ্যে ১০% ডেড স্টক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা সরবরাহযোগ্য নয়।
সাম্প্রতিক সরবরাহ পরিস্থিতি অনুযায়ী, সোমবার ‘এমটি জিউ চি’ জাহাজ ২৭,২০৪ টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রামে এসে খালাস করেছে। মঙ্গলবার ২৭,০০০ টন ডিজেল নিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে ‘এমটি লিয়ান হুয়ান হু’ এবং ৩০,০০০ টন ডিজেল নিয়ে মালয়েশিয়া থেকে ‘এসপিটি থেমিস’ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে।
সরবরাহ চেইন সচল রাখার উদ্যোগ
বিপিসির বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগের নতুন দায়িত্ব গ্রহণকারী মহাব্যবস্থাপক মোরশেদ হোসাইন আজাদ জানান, “মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। মানুষ মনে করছে দেশেও দাম বাড়বে। যারা এই ব্যবসায় যুক্ত নয়, তারাও তেল কৃত্রিমভাবে মজুত করছে। এটি একটি প্যানিক। এখন যে পরিমাণ তেল ব্যবহার হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি কিনে মজুত করা হচ্ছে। সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখার জন্য সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। প্যানিক কাটলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।”

