বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। এই পরিস্থিতিতে শিল্পখাতের সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।
গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেন বিজিএমইএর একটি প্রতিনিধিদল। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি শিল্পখাতের চলমান সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরুরি সহায়তা কামনা করে এবং একাধিক সুপারিশ তুলে ধরে।
প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বিজিএমইএর পরিচালক মজুমদার আরিফুর রহমান, পরিচালক ড. রশিদ আহমেদ হোসাইনী এবং মাহিন অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ-আল-মাহমুদ মাহিন। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তৈরি পোশাকশিল্প বর্তমানে কঠিন সময় অতিক্রম করছে। কিছু ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল করলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সরবরাহ করা হচ্ছে না। এর ফলে একদিকে কারখানা সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে সময়মতো ঋণ পরিশোধও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সংকট মোকাবিলায় শিল্পখাতকে টিকিয়ে রাখা এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে নীতি সহায়তার আওতায় নগদ প্রণোদনা বাড়ানোর দাবি জানান বিজিএমইএ নেতারা। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, বিশেষ নগদ সহায়তার হার শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা উচিত। শুল্ক বন্ড ও ডিউটি ড্র-ব্যাংকের পরিবর্তে বিকল্প নগদ সহায়তার হার ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করারও সুপারিশ করা হয়।
বিজিএমইএ নেতারা সতর্ক করে বলেন, প্রণোদনার অর্থ দ্রুত এবং নিয়মিতভাবে ছাড় না হলে অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এর ফলে শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া শিল্পকে সহায়তা দিতে প্যাকিং ক্রেডিটের (পিসি) সুদের হার ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের তহবিল ৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা করার এবং এই তহবিলের মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি রপ্তানি ঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা এবং এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
বিজিএমইএর উপস্থাপিত প্রস্তাব ও শিল্পখাতের সমস্যাগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নগদ সহায়তার বিষয়ে তিনি বলেন, এখন থেকে কোনো আবেদন ঝুলে থাকবে না। রপ্তানিকারকদের তারল্য সংকট কমাতে প্রতি মাসের নগদ সহায়তার অর্থ সংশ্লিষ্ট মাসেই ছাড় করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বৈঠকে বিজিএমইএ প্রতিনিধিরা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকগুলোতে—যার মধ্যে সাবেক এক্সিম ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ অন্য ব্যাংক রয়েছে—জমা রাখা স্থায়ী আমানত ও রপ্তানি আয়ের অর্থ নগদায়নে সমস্যার কথাও তুলে ধরেন। তাদের মতে, তারল্য সংকটের কারণে অনেক কারখানা শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং বিদ্যুৎ বিল মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
এই বিষয়ে গভর্নর জানান, সমস্যাটি সমাধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিশেষ নজরদারি রাখা হবে। বিজিএমইএ প্রতিনিধিদল আশা প্রকাশ করেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্রুত পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দেশের পোশাকশিল্প ঘুরে দাঁড়াতে পারবে এবং বিপুল কর্মসংস্থান ধরে রাখা সহজ হবে।

