বিশ্বের বড় ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনা শুধুমাত্র যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পৌঁছে যায় তেলের বাজার, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন, প্রবাসী শ্রমবাজার এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশের অর্থনীতিতে।
সম্প্রতি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য এক বড় ভূরাজনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যেই বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি করেছে। যদিও যুদ্ধক্ষেত্র বাংলাদেশ থেকে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে, তবুও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, এর প্রভাব দেশটিতে বড় হতে পারে। কারণ বাংলাদেশ জ্বালানির জন্য পুরোপুরি আমদানি নির্ভর, এবং প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, এই যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত তিনটি মাধ্যমে আঘাত পেতে পারে—জ্বালানি, ডলার এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম।
তিনি এই সম্ভাব্য ধাক্কাকে সাময়িক ঝড়ের সঙ্গে তুলনা না করে ‘ভূমিকম্পের মতো’ আখ্যায়িত করেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “ঝড় বা বন্যা সাময়িকভাবে আসে এবং চলে যায়। পানি বেড়ে আবার নেমে আসে। ক্ষতি হয়, কিন্তু পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়। কিন্তু ভূমিকম্প ভেতরের কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর প্রভাব মানুষের জীবন ও সম্পত্তির ওপর দীর্ঘস্থায়ী হয়।” জাহিদ হোসেন আরও বলেন, যুদ্ধের প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে সংঘাতের তীব্রতা এবং স্থায়িত্বের ওপর। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ক্ষতির পরিমাণ তত বাড়বে। মূল প্রশ্ন শুধু ধাক্কাটির তীব্রতা নয়; এটি কতদিন স্থায়ী হবে তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—বাংলাদেশকে জ্বালানি মূল্য, রপ্তানি প্রতিযোগিতা, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও মূল্যস্ফীতি সব দিক থেকে অস্থিরতার মুখোমুখি হতে হবে।
জ্বালানি খাতের বিপর্যয়ের সংকেত
ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক তেলের বাজারে। গতকাল পর্যন্ত তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৯ ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে এক বছর আগে এটি ছিল প্রায় ৭২ ডলার। উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম কেন্দ্র। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর তেহরান গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
শিপিং কোম্পানিগুলো সাময়িকভাবে বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের নতুন বুকিং বন্ধ করেছে। দেশের জন্য এর পরিণতি ভয়ঙ্কর হতে পারে। কারণ কাঁচা তেল থেকে শুরু করে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)—প্রায় সব ধরনের জ্বালানি বাংলাদেশ আমদানি নির্ভর। বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে দেশের জ্বালানি খরচও সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যাবে। এত ভয়ঙ্করে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং জ্বালানি রেশনিং চালু করেছে।
তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনের খরচও বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে সরকারকে দুই কঠিন বিকল্পের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—বর্ধিত ভর্তুকি দিয়ে খরচ নিজেরাই বহন করবে, নাকি জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর চাপাবে। উভয় সিদ্ধান্তেরই অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। ভর্তুকি বাড়ালে সরকারি বাজেটের ওপর চাপ বাড়বে, আর দেশে জ্বালানির দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বাড়বে।
মূল্যস্ফীতি নতুন করে বাড়ার আশঙ্কা
ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক তেলের বাজারে। গতকাল পর্যন্ত তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৯ ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে এক বছর আগে এটি ছিল প্রায় ৭২ ডলার।
উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম কেন্দ্র। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর তেহরান গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
শিপিং কোম্পানিগুলো সাময়িকভাবে বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের নতুন বুকিং বন্ধ করেছে। দেশের জন্য এর পরিণতি ভয়ঙ্কর হতে পারে। কারণ কাঁচা তেল থেকে শুরু করে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)—প্রায় সব ধরনের জ্বালানি বাংলাদেশ আমদানি নির্ভর। বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে দেশের জ্বালানি খরচও সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যাবে।
এত ভয়ঙ্করে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং জ্বালানি রেশনিং চালু করেছে।
তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনের খরচও বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে সরকারকে দুই কঠিন বিকল্পের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—বর্ধিত ভর্তুকি দিয়ে খরচ নিজেরাই বহন করবে, নাকি জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর চাপাবে। উভয় সিদ্ধান্তেরই অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। ভর্তুকি বাড়ালে সরকারি বাজেটের ওপর চাপ বাড়বে, আর দেশে জ্বালানির দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বাড়বে।
বৈদেশিক মুদ্রা ও প্রবাসী আয় অস্থিরতার মুখে
জ্বালানি খাতের চাপ সাধারণত কেবল তেল বা বিদ্যুতের সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের ওপর।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ের অন্যতম বড় খাত হলো জ্বালানি আমদানি। তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় এবং মুদ্রাবাজারে অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশ আগেও রিজার্ভ সংকটে পড়েছে। নতুন করে জ্বালানি খাতে ধাক্কা লাগলে চলতি হিসাবের ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি, ডলারের চাহিদা বাড়লে টাকার ওপর আবার অবমূল্যায়নের চাপ তৈরি হতে পারে। এর ফলে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির চাপও বৃদ্ধি পাবে।
প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমশক্তির সবচেয়ে বড় বাজার মধ্যপ্রাচ্য। ২০২৫ অর্থবছরে প্রায় ৮৬ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন, যার প্রায় অর্ধেকই সৌদি আরবের কর্মী। বাংলাদেশ ইকোনমিক রিভিউ-২০২৫ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করা প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৭৫ শতাংশ।
যদি সংঘাত তীব্র হয়, উপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ধীর হয়ে যেতে পারে। এতে প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়তে পারে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যেতে পারে। রেমিট্যান্সের গতি কমলেও বৈদেশিক বাণিজ্যের স্থিতিশীলতার ওপর চাপ বাড়বে, কারণ আমদানি ব্যয় পূরণের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ।
বৈশ্বিক বাণিজ্য পথেও যুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে। সংঘাতকালে শিপিং কোম্পানিগুলো বিমার প্রিমিয়াম বাড়ায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে ভিন্ন পথে জাহাজ চলাচল করলে ভাড়া বেড়ে যায়। এর ফলে রপ্তানি কেন্দ্রিক শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের লজিস্টিক খরচ বাড়তে পারে এবং প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমতে পারে। আমদানিকারকরাও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, যন্ত্রপাতি ও শিল্প উপকরণের জন্য বেশি খরচের মুখোমুখি হবে, যা বাজারে পণ্যের দাম বাড়াবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থা এখনও নাজুক। বিদ্যুৎ উৎপাদন মূলত আমদানি করা জ্বালানি এবং এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক গ্যাস বাজার সংকীর্ণ হলে বা এলএনজির দাম দ্রুত বাড়লে সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ কঠিন হয়ে যাবে। এতে শিল্প উৎপাদন, বিশেষ করে জ্বালানি-নির্ভর খাত যেমন উৎপাদন ও টেক্সটাইল খাতে প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, তিনটি প্রধান ঝুঁকি আছে—জ্বালানি, ডলার এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রবাহ।
-
জ্বালানি: দাম বৃদ্ধি এবং প্রাপ্যতা উভয়ই সমস্যা। সরবরাহ ব্যাহত হলে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
-
ডলার: বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাড়লে ডলারের দাম বৃদ্ধি পায়, আমদানি খরচ বেড়ে যায়। একই পরিমাণ ডলার কিনতেও বেশি টাকা খরচ করতে হয়, যা মূল্যস্ফীতিকে তীব্র করে।
-
বাণিজ্য ও আর্থিক প্রবাহ: ভাড়া, বন্দর খরচ এবং বিমার প্রিমিয়াম বাড়ছে, যা বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি রেমিট্যান্স প্রবাহের ঝুঁকিও তুলে ধরেন। সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও বেতনের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি পেমেন্ট সিস্টেমেও সমস্যা হতে পারে, যা অর্থ পাঠাতে প্রভাব ফেলে। জাহিদ হোসেনের মন্তব্য অনুযায়ী, জ্বালানি সরবরাহ, বৈদেশিক স্থিতি এবং আর্থিক খাত—এই তিনটি ক্ষেত্রের সম্মিলিত প্রভাব শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি, প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং মজুরি পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশকে উদ্ভূত ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য জরুরি প্রস্তুতি পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত। তিনি জানান, দেশে ইতোমধ্যেই যেসব বৈদেশিক অর্থ আসার পথে আছে তা কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা ভাবা দরকার। এই তহবিল রিজার্ভে কয়েক বিলিয়ন ডলার যোগ করতে পারে, যা বৈদেশিক বাণিজ্যে চাপ কমাতে সহায়তা করবে।
মুস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, অতিরিক্ত সহায়তার সুযোগও বিবেচনা করতে হবে। যেমন, বিশ্বব্যাংক বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বাজেটীয় সহায়তা। যদি জ্বালানি আমদানির খরচ হঠাৎ বেড়ে যায়, কেবল রিজার্ভের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট হবে না। এ ক্ষেত্রে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে আমদানি ক্রেডিট সুবিধা গ্রহণের মতো অর্থায়ন ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, আগেভাগে জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে যুদ্ধের সম্ভাব্য প্রভাব ও প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করেননি। তবে তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।”

