বিশ্বজুড়ে ধনী মানুষের সংখ্যা আর তাদের সম্পদের পরিমাণ উভয়ই নতুন রেকর্ড গড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার, উত্থানমান শেয়ারবাজার এবং বিভিন্ন দেশের সহায়ক আর্থিক নীতির কারণে এই বৃদ্ধির গতি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিন সম্প্রতি প্রকাশিত তালিকায় দেখা গেছে, বর্তমানে বিশ্বের ৩ হাজার ৪২৮ জন বিলিয়নিয়ার বা শতকোটিপতি আছেন। তালিকায় রয়েছেন উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং উত্তরাধিকারের মাধ্যমে ধনী হওয়া মানুষরাও। এবারে নতুন করে তালিকায় স্থান পেয়েছেন প্রায় ৪০০ জন।
ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, সারা বিশ্বের বিলিয়নিয়ারদের সম্মিলিত সম্পদ এখন প্রায় ২০ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে অতিধনীদের মোট সম্পদ বেড়েছে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলার। বিলিয়ন মানে ১০০ কোটি এবং ট্রিলিয়ন মানে এক লাখ কোটি। যাদের সম্পদ ১০০ কোটি মার্কিন ডলার বা তার বেশি, তাঁদের বিলিয়নিয়ার বা শতকোটিপতি বলা হয়।
দেশভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি শতকোটিপতির বসবাস যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে ৯৮৯ জন বিলিয়নিয়ার রয়েছেন। বিশ্বের শীর্ষ ২০ ধনীর মধ্যে ১৫ জনই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। দ্বিতীয় অবস্থানে চীন, যেখানে বিলিয়নিয়ার সংখ্যা ৬১০। তৃতীয় স্থানে আছে ভারত, ২২৯ জন বিলিয়নিয়ারসহ। প্রথম দুই দেশের সঙ্গে ভারতের ব্যবধান স্পষ্ট।
ফোর্বসের ইতিহাসে একসময় শীর্ষ ধনী ছিলেন বিল গেটস। কিন্তু কয়েক বছর ধরে দান-অনুদান এবং সম্পদের পরিমাণের পরিবর্তনের কারণে এবার তিনি ১৯তম স্থানে রয়েছেন। একইভাবে, ভারতের একসময়কার শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানি এবার ২১তম স্থানে নেমে গেছেন।
চলতি বছরের ১ মার্চ পর্যন্ত শেয়ার মূল্য ও মুদ্রা বিনিময় হার অনুযায়ী ফোর্বস অতিধনীদের সম্পদ হিসাব করেছে। তবে পুঁজিবাজারের ওঠানামার কারণে সম্পদের পরিমাণ প্রতিদিনই পরিবর্তিত হয়। ফোর্বসের রিয়েলটাইম তালিকায় এই পরিবর্তন স্পষ্ট দেখা যায়; যেমন তালিকার দশম স্থানে থাকা স্পেনের আর্মানিকো ওর্তেগা ইতিমধ্যেই ১৪তম স্থানে নেমে গেছেন।
বিশ্বে নতুন সম্পদ সৃষ্টির সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে প্রযুক্তি খাত, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উঠে এসেছে। শক্তিশালী পুঁজিবাজার এবং নীতিগত সহায়তা মিলিয়ে অতিধনীদের সম্পদ দ্রুত বাড়ছে।
১. ইলন মাস্ক (যুক্তরাষ্ট্র) – সম্পদ: ৮৩৯ বিলিয়ন ডলার
যুক্তরাষ্ট্রের টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক শীর্ষ ধনী হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। টেসলার ছাড়াও তিনি স্পেসএক্স, এক্স (সাবেক টুইটার) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান এক্সএআইয়ের সঙ্গে যুক্ত। টেসলার শেয়ারের ১২ শতাংশ মালিকানা ছাড়াও প্রধান নির্বাহী হিসেবে বিপুল বেতন পান। গত বছর তাঁকে অতিরিক্ত এক লাখ কোটি ডলারের শেয়ার দেওয়া হয়েছে, ফলে বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে সম্পদ ৮০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
২. ল্যারি পেইজ (যুক্তরাষ্ট্র) – সম্পদ: ২৫৭ বিলিয়ন ডলার
গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেইজ দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন। তাঁর সম্পদ গত নভেম্বর থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। একসময় গুগলের প্রধান নির্বাহী ছিলেন তিনি। বর্তমানে উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার হিসেবে প্রযুক্তি, বিজ্ঞাপন, এআই ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ে বৈশ্বিক প্রভাব ফেলছেন।
৩. সের্জেই ব্রিন (যুক্তরাষ্ট্র) – সম্পদ: ২৩৭ বিলিয়ন ডলার
গুগলের অন্য সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্জেই ব্রিন। জন্ম সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কোয়। ল্যারি পেইজের সঙ্গে মিলিত হয়ে গুগল প্রতিষ্ঠা করেন। পরে অ্যালফাবেটেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
৪. জেফ বেজোস (যুক্তরাষ্ট্র) – সম্পদ: ২২৪ বিলিয়ন ডলার
অ্যামাজনের সহপ্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস চতুর্থ স্থানে রয়েছেন। গত বছরের তুলনায় তাঁর সম্পদ কমেছে, কিন্তু শীর্ষ পাঁচে অবস্থান বজায় রয়েছে। বেজোস প্রযুক্তিকে মানবসভ্যতার সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে নিচ্ছেন বলে মনে করেন এবং ভবিষ্যতে মহাকাশে এক কোটি মানুষ বসবাস করবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন।
৫. মার্ক জাকারবার্গ (যুক্তরাষ্ট্র) – সম্পদ: ২২২ বিলিয়ন ডলার
ফেসবুকের সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ পঞ্চম স্থানে। সম্পদ সামান্য কমলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভার্চুয়াল বাস্তবতা ও মেটাভার্স প্রযুক্তি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
৬. ল্যারি এলিসন (যুক্তরাষ্ট্র) – সম্পদ: ১৯০ বিলিয়ন ডলার
ওরাকলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসন ষষ্ঠ স্থানে। প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ডেটাবেজ সফটওয়্যার ও করপোরেট প্রযুক্তি সমাধানকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এখন নির্বাহী দায়িত্ব না থাকলেও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
৭. বার্নার্ড আর্নল্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি (ফ্রান্স) – সম্পদ: ১৭১ বিলিয়ন ডলার
বিলাসদ্রব্য প্রতিষ্ঠান এলভিএমএইচের সহপ্রতিষ্ঠাতা বার্নার্ড আর্নল্ট সপ্তম স্থানে। লুইস ভিটন, ডিওর, টিফানি, সেফোরা ইত্যাদি ব্র্যান্ডের মাধ্যমে বৈশ্বিক বিলাসপণ্যের বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
৮. জেনসেন হুয়াং (যুক্তরাষ্ট্র) – সম্পদ: ১৫৪ বিলিয়ন ডলার
এনভিডিয়ার সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং প্রযুক্তি খাতে বিশেষ অবদান রাখছেন। গ্রাফিকস প্রসেসর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিংয়ে কোম্পানির নেতৃত্বে আছেন।
৯. ওয়ারেন বাফেট (যুক্তরাষ্ট্র) – সম্পদ: ১৪৯ বিলিয়ন ডলার
বিনিয়োগ গুরু ও বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের সাবেক প্রধান নির্বাহী ওয়ারেন বাফেট দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কৌশলে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বিমা, জ্বালানি, রেলপথ ও ভোগ্যপণ্যে বিনিয়োগের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
১০. আর্মানিকো ওর্তেগা (স্পেন) – সম্পদ: ১৪৮ বিলিয়ন ডলার
স্পেনের ফ্যাশন উদ্যোক্তা ওর্তেগা ইন্ডটেক্স প্রতিষ্ঠা করেছেন। দ্রুত উৎপাদন, সরাসরি বিপণন ও গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী সামঞ্জস্য রিটেইল বিপ্লবের উদাহরণ। আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলেছেন।

