গত এক দশকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নারীর অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক তথ্য একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা প্রকাশ করছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাত্র ছয় মাসে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৭৭০ জন কমেছে। সংখ্যা আপাতদৃষ্টিতে বেশি নয়, তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে! অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে ব্যাংকিং এখনো নারীর জন্য স্থিতিশীল নয়।
বর্তমানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মোট কর্মীর মধ্যে নারীর অংশ মাত্র ১৬-১৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ এই খাত এখনও মূলত পুরুষপ্রধান। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিদেশি ব্যাংকে নারীর অংশ কিছুটা বেশি হলেও সামগ্রিকভাবে নারীর উপস্থিতি সীমিত।
নারীর কম উপস্থিতি শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যা নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বিশ্বব্যাপী গবেষণা দেখায়, যেখানে জেন্ডার বৈচিত্র্য বেশি, প্রতিষ্ঠানগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছ, গ্রাহকসেবা উন্নত ও উদ্ভাবনী দিক থেকে শক্তিশালী। ব্যাংকিং খাত দেশের অর্থনীতির মূল চালক হওয়ায় নারীর অংশগ্রহণ কমে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সতর্কসংকেত।
নারী কর্মী কমে যাওয়ার পেছনে রয়েছে একাধিক কাঠামোগত ও সামাজিক কারণ। কিছু ব্যাংকের আর্থিক সংকট, পুনর্গঠন বা একীভূতকরণের সম্ভাবনা কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত ডে-কেয়ার সুবিধার অভাব এবং কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জও নারীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
নেতৃত্ব পর্যায়ে নারীর কম উপস্থিতি
কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্ব পর্যায়ে নারীর তুলনামূলক কম উপস্থিতি একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। যেখানে নারীর নেতৃত্বের উদাহরণ কম, সেখানে তরুণ পেশাজীবীদের জন্য ক্যারিয়ার অগ্রগতির পথ অস্পষ্ট থাকে। ফলে দক্ষ নারীরা ধীরে ধীরে এই খাত থেকে সরে যান।
কর্মজীবনে বিরতি নেওয়া নারীরা
ব্র্যাকের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ পেশাদার নারী যাঁরা কর্মজীবনে বিরতি নিয়েছেন, তাঁদের প্রধান কারণ পারিবারিক দায়িত্ব ও মাতৃত্ব। জরিপে ৩৮.৮ শতাংশ নারী পারিবারিক দায়ভার এবং ৩৬ শতাংশ মাতৃত্বকে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ব্যক্তিগত কারণ, উচ্চশিক্ষা, প্রতিকূল কর্মপরিবেশ ও সামাজিক চাপও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। এটি প্রমাণ করে, কাঠামোগত ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে অনেক দক্ষ নারী বাধ্য হয়ে চাকরি ছাড়ছেন।
ভালো দিক হলো, বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান নারীদের কর্মজীবনে পুনঃফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। ওয়াটারএইড বাংলাদেশ ও ব্র্যাক ‘ব্রিজ রিটার্নশিপ’ বা ‘ওমেন রিটার্নশিপ’ প্রোগ্রাম চালু করেছে, যেখানে নারীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে পুনঃকর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়। সিটি ব্যাংকও এমন কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এ ধরনের উদ্যোগ সম্প্রসারিত হলে দেশের দক্ষ নারী মানবসম্পদ ধরে রাখা সম্ভব হবে।
নীতি ও করণীয়
বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়েছে। শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থানে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে নীতি ও কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তবে উচ্চ দক্ষতাভিত্তিক পেশায় নারীর টেকসই অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আরও লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসমূহ:
১. কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সুবিধা ও মাতৃত্বকালীন সহায়তা জোরদার করা, যাতে নারী চাকরি না ছাড়েন।
২. সিনিয়র সিটিজেন বা পরিবারের দায়িত্বের কারণে বিরতি নেওয়া নারীদের জন্য ক্যারিয়ার ফিরে আসার প্রোগ্রাম চালু করা।
৩. কেয়ারগিভার ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিবারের দায়িত্বে পুরুষদের সহযোগিতা ও সচেতনতা বৃদ্ধি।
৪. নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং নেতৃত্ব পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো।
সরকার ইতোমধ্যে নারীকেন্দ্রিক ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছে, যা নারীর অবদান স্বীকৃতির গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। নারীর কর্মসংস্থান শুধু আয়ের বিষয় নয়; এটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও পরবর্তী প্রজন্মের উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর আয় প্রধানত পরিবারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কল্যাণে ব্যয় হয়।
বাংলাদেশ নারী উন্নয়নে ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইতিবাচক উদাহরণ স্থাপন করেছে। এখন সময় এসেছে নীতি, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক মানসিকতার সমন্বিত পরিবর্তনের মাধ্যমে সেই অগ্রগতিকে আরও শক্তিশালী করার। এতে দক্ষ ও শিক্ষিত নারী টিকে থাকতে পারবে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সাম্প্রতিক প্রবণতাকে শুধুই পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা যাবে না। এটি একটি সতর্কসংকেত, যা মনে করিয়ে দেয়, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কর্মক্ষেত্রে নারী–পুরুষ ভারসাম্য নিশ্চিত করা অতীব জরুরি।

