ইরানকে ঘিরে বাড়তে থাকা যুদ্ধ পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও।
বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তা দেশের মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার কমানোর উদ্যোগও চাপে পড়তে পারে।
টানা চার মাস ধরে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এটি এখন গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দেশের ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে। খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিই এ প্রবণতার প্রধান কারণ। তবে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার খরচও ধীরে ধীরে বাড়ছে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
আমদানি করা জ্বালানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা অনেক বেশি। বিশেষ করে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) দেশের জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব দ্রুত দেশের অর্থনীতিতে এসে পড়ে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়ে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তেল ও এলএনজির দাম দ্রুত বাড়তে পারে। তার মতে, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যে আবার ৯ শতাংশের ঘরে উঠেছে। ইরানকে ঘিরে সংকট পরিস্থিতি এ চাপকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি লেনদেন হচ্ছে। জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এসব বাড়তি খরচের চাপ সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই পড়ে।
অধ্যাপক সেলিম রায়হান আরও বলেন, টাকার অবমূল্যায়ন এবং খাদ্যবাজারের অস্থিরতার কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ এখন দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এর ফলে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি ভারত ও চীনের কাছে ডিজেল আমদানির অনুরোধ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) চীনের ‘ইউনিপেক’ থেকে ডিজেলের তিনটি কার্গো পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
অন্যদিকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, রাশিয়া থেকে তেল আমদানির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশেষ ছাড় বা ওয়েইভার চাওয়া হয়েছে।
জ্বালানি ব্যয় কমাতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।
এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী আয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকরা চাকরি হারালে রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে টাকার মানও আবার কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে প্রতি ডলার প্রায় ১২৩ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। এর ফলে আমদানি করা পণ্য ও কাঁচামালের দাম আরও বেড়ে যাচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দিতে পারে।
অর্থনীতিবিদ জিয়া হাসান মনে করেন, মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে থাকলে সুদের হার কমানোর সুযোগ খুবই সীমিত থাকে। তার মতে, মুদ্রানীতি শিথিল করা হলে টাকার বিনিময় হারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
বিশ্ববাজারে অস্থিরতা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে বাংলাদেশের সামনে নতুন অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। তখন উচ্চ আমদানিব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে দেশকে।

