বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের প্রায় ৩৮ শতাংশ আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘর্ষের পর মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি অস্থিরতা এসব দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ওপর প্রভাব ফেলেছে। তবে এই সংকটের মধ্যেও প্রবাসী আয় বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি, বরং কিছুটা বেড়েছে। একই সময়ে দেশের ডলারের বাজারেও ওঠানামা দেখা গেছে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে কেন্দ্র করে কিছু শঙ্কা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, “মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রবাসীরা আতঙ্কে আছেন। তারপরও ঈদ এবং জাকাতের কারণে তারা দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন। তাই এই সংকটের মধ্যেও প্রবাসী আয় বেড়েছে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মার্চ মাসের প্রথম ১১ দিনে দেশে এসেছে ১৯২ কোটি মার্কিন ডলার প্রবাসী আয়। এর মধ্যে ১১ মার্চ একদিনে এসেছে ১৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে দেশে এসেছে ১৩৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের তুলনায় মার্চের প্রথম ১১ দিনে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৪৪ শতাংশের বেশি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত দেশে এসেছে ২,৪৩৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার প্রবাসী আয়। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ছিল ১,৯৮২ কোটি ডলার। ফলে এ সময়ের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৩ শতাংশ।
প্রবাসী আয়ের এই চাঙা ধারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ১১ মার্চ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩,৪২৯ কোটি ডলার বা ৩৪.২৯ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুযায়ী, পূর্বে এটি ছিল ২,৯৫৬ কোটি ডলার।
ডলারের দাম বাড়ছে
মধ্যপ্রাচ্য অস্থিরতার প্রভাব নিয়ে ডলারের বাজারেও ওঠানামা দেখা গেছে। ব্যাংকগুলো ১২৩ টাকা ৩০ পয়সা দরে প্রবাসী আয়ের ডলার কিনেছে, যা আগে ১২২ টাকা ৯০ পয়সা ছিল। আমদানিতেও ডলারের দাম বেড়ে ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা ছাড়িয়েছে। একজন আমদানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ব্যাংকগুলো মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে কাজে লাগিয়ে হঠাৎ ডলারের দাম এক টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এতে আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম ভোক্তা পর্যায়েও বাড়বে।”
সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তার কারণে রেমিট্যান্স হাউসগুলো বেশি দামে ডলার প্রস্তাব করছে। পূর্বে ১২২ টাকায় কেনা যেত, এখন ১২৩ টাকার বেশি দরে কেনা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তাফা কে মুজেরী বলেন, “মধ্যপ্রাচ্য আমাদের প্রবাসী আয়ের প্রধান উৎস। সরকারকে সেখানে অবস্থানরত শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে হবে। যেসব দেশে যুদ্ধের ক্ষতি হয়েছে, সেখানে পুনর্গঠন শুরু হলে বেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হবে। আমরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারি।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত মুদ্রা হারের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৩ মার্চ ডলারের গড় দাম ছিল ১২২.৩৩ টাকা, মঙ্গলবার বেড়ে ১২২.৫৮ টাকা এবং সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ১২২.৭৫ টাকা। একজন শীর্ষ ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, “ডলারের দাম ১২৩ টাকার বেশি বাড়বে না—এমন বার্তা এসেছে। তবে আমদানির চাপ ও সরবরাহ কমে গেলে দাম বাড়তে পারে। তখন রিজার্ভ থেকেও ডলার সহায়তা দিতে হতে পারে।”
অর্থনীতিবিদরা বাংলাদেশ ব্যাংককে পরামর্শ দিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে সম্ভাব্য ধাক্কা সামলাতে রিজার্ভ ধরে রাখতে হবে। তারা সুদহারও এখনই কমানোর পরামর্শ দেননি। এ ছাড়া জ্বালানির জন্য বিকল্প উৎস খুঁজে নিতে হবে এবং বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও তা এখনই গ্রাহকের ওপর চাপানো ঠিক হবে না, যাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকে।

