যাকাত ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ, অর্থাৎ পঞ্চস্তম্ভের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ গরীব, দারিদ্র, এবং অভাবগ্রস্থদের জন্য দেওয়া হয়। যাকাত মূলত আমাদের ধন-সম্পদের স্বচ্ছতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতীক।
যাকাত কেবল দাতাদের জন্য আধ্যাত্মিক পুণ্য নয়, এটি সমাজে অর্থের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করে। ইসলামে অর্থ, সোনা-রুপা, ব্যবসা বা আবাদযোগ্য ফসলের মতো বিভিন্ন সম্পদের উপর যাকাত দেওয়া বাধ্যতামূলক। সাধারণভাবে, সম্পদের ২.৫% অংশ প্রতি বছর যাকাত হিসেবে দেওয়া হয়। যাকাতের মূল উদ্দেশ্য হলো সম্পদকে ব্যক্তিগত দখল থেকে সামাজিক কল্যাণে রূপান্তর করা। এটি দারিদ্র দূর করতে সাহায্য করে এবং সমাজে সমতার বোধ জাগায়। সুতরাং, যাকাত শুধু দাতাদের জন্য নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব, যা আমাদের অর্থনৈতিক ও মানবিক দায়িত্বকে সমন্বিত করে। জেনে নেই ব্যাংক লোন বা ঋণ থাকলে যেভাবে জাকাতের হিসাব করবো।
প্রশ্ন: জাকাতের নিয়ম অনুযায়ী তো ঋণ থাকলে তা মোট সম্পদ থেকে বাদ দেওয়ার কথা। বর্তমানে বড় বড় ব্যবসায়ীরা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়া বা ভবন নির্মাণের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যাংক লোন নিয়ে থাকেন। জাকাত হিসাবের সময় কি এই বিশাল অংকের লোন বিয়োগ করা যাবে?
উত্তর: সাধারণ কর্জ বা ঋণের ক্ষেত্রে নিয়ম হলো, তা জাকাতযোগ্য সম্পদ থেকে বিয়োগ করে বাকি অংশের জাকাত দেওয়া। কিন্তু বর্তমান শিল্প বিপ্লবের যুগে ঋণের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে বড় বড় ব্যবসায়ী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধানটি গভীরভাবে বোঝা প্রয়োজন।
১. সাধারণ ঋণ বনাম উন্নয়নমূলক (Development) ঋণ
ইসলামি ফিকহ শাস্ত্রের আলোকে, ব্যক্তিগত প্রয়োজন বা জীবনধারণের জন্য নেওয়া সাধারণ ঋণ জাকাতের হিসাব থেকে বাদ দেওয়া যায়। কিন্তু শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, বড় বাণিজ্যিক কলকারখানা স্থাপন বা রিয়েল এস্টেট ব্যবসার প্রয়োজনে যে কোটি কোটি টাকার লোন নেওয়া হয়, পরিভাষায় একে ‘ডেভেলপমেন্ট লোন’ বা উন্নয়নমূলক ঋণ বলা হয়।
২. কেন উন্নয়নমূলক ঋণ বিয়োগ হবে না
উন্নয়নমূলক লোনের মাধ্যমে যে সম্পদ তৈরি হয় (যেমন- কারখানার দালান, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি), সেগুলো মূলত জাকাতযোগ্য সম্পদের (যেমন- কাঁচামাল বা নগদ টাকা) অন্তর্ভুক্ত নয়। যেহেতু ঋণের বিপরীতে বিশাল স্থাবর সম্পত্তি বা ফিক্সড এসেট তৈরি হচ্ছে, তাই জাকাতের হিসাব করার সময় এই ডেভেলপমেন্ট লোন মোট সম্পদ থেকে বিয়োগ করা যাবে না।
৩. বড় ব্যবসায়ীদের জন্য সতর্কতা
বর্তমানে অনেক বড় বড় ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি ঋণী। তারা ব্যাংক থেকে মোটা অংকের লোন নিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন। তারা যদি এই বিশাল লোন জাকাতের হিসাব থেকে বিয়োগ করেন, তবে দেখা যাবে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের ওপর কোনো জাকাত আসছে না। এটি শরিয়তের মূল মাকসাদের পরিপন্থি। সুতরাং বাণিজ্যিক বা উন্নয়নমূলক ঋণের কিস্তি বা লোন জাকাতযোগ্য সম্পদ থেকে বাদ দেওয়া যাবে না।
ব্যক্তিগত সাধারণ ঋণ জাকাতের হিসাব থেকে বাদ দেওয়া গেলেও বাণিজ্যিক ও উন্নয়নমূলক বড় লোন বিয়োগ হবে না। ব্যবসায়ী ভাইদের উচিত স্বচ্ছতার সঙ্গে তাদের চলতি সম্পদ ও নগদ টাকার ওপর জাকাত হিসাব করা।
ব্যবসায়িক ঋণের ধরন ও জাকাতের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণে সমসাময়িক মাসআলায় দক্ষ কোনো ‘দারুল ইফতা’ বা মুফতি সাহেবের সরাসরি শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। বিশেষ করে ‘মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা’-এর ফতওয়া বিভাগ এ ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ভূমিকা পালন করছে।
- লেখক: মুফতি উমর ফারুক আশিকী, আলেম ও সাংবাদিক

