সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন, “দেশের সব কোচিং সেন্টার বন্ধ করা হবে। এই দেশে আর কোচিং সেন্টার চলতে দেওয়া হবে না।”
এই বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের জনপ্রিয় অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন তাঁর ফেসবুক আইডিতে একটি বিশ্লেষণধর্মী পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি কোচিং বাণিজ্য বন্ধে কেবল হুমকি-ধামকি না দিয়ে সমস্যার মূল কারণ বা ‘রুট কজ’ মেরামতের ওপর জোর দিয়েছেন।
কোচিং বাণিজ্যের মূলে ‘কজ অ্যান্ড ইফেক্ট’
অধ্যাপক মামুন তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, যেকোনো ঘটনা আসলে ‘Cause and Effect’ বা ‘কার্যকারণ’ সম্পর্কের ফল। তিনি মনে করেন, কোচিং বাণিজ্য বাংলাদেশে যে মহামারি আকার ধারণ করেছে, তার দৃশ্যমান রূপটি হলো ‘ফল’ (Effect)। কিন্তু এর পেছনে যে ‘কারণ’ (Cause) রয়েছে, তা মেরামত না করে কেবল ফলকে বন্ধ করার চেষ্টা সবসময়ই ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর মতে, গত ২৫-৩০ বছরে প্রতিটি সরকারই এই রুটিনমাফিক হুমকি দিয়ে এসেছে, কিন্তু সমাধান করতে পারেনি।
|
শিক্ষকদের বেতন ও নৈতিক সংকট
অধ্যাপক মামুনের মতে, কোচিং বাণিজ্য রমরমা হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো:
- শিক্ষকদের স্বল্প বেতন: শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী বেতন অত্যন্ত কম (গরিবানা বেতন)।
- দুর্নীতির সুযোগহীনতা: শিক্ষকতা পেশায় অন্য অনেক পেশার মতো ঘুষ বা দুর্নীতির সুযোগ নেই।
- চাহিদা তৈরি: বাধ্য হয়ে বা সচ্ছলতার আশায় শিক্ষকরা ক্লাসরুমে কম পড়িয়ে বাইরে পড়ার একটি কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করেন।
- ফলাফলের প্রলোভন: যারা শিক্ষকের কাছে ব্যক্তিগতভাবে পড়ে, তাদের বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো নম্বর বা ফলাফলের প্রলোভন দেখানো হয়।
কারিকুলাম ও নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা
অধ্যাপক জাফর ইকবালের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কারিকুলাম পরিবর্তন করলেই কোচিং বন্ধ হয়ে যাবে—এমন ধারণা ‘অপরিপক্ক’। তিনি মনে করেন, নীতিনির্ধারকরা অনেক সময় সরকারকে খুশি করার জন্য এমন কথা বলেন যা বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি আরো যোগ করেন, পৃথিবীর সব দেশেই কোচিং ব্যবস্থা আছে, তবে তা চলে নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুন মেনে। বাংলাদেশে এই শৃঙ্খলা নেই কারণ কোনো সরকারই সমস্যার সঠিক ডায়াগনসিস (রোগ নির্ণয়) করেনি।
পরিশেষে, অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুনের মতে, শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটি দূর না করে কেবল হুমকি দিয়ে কোচিং বন্ধ করা সম্ভব নয়। বারবার একই ধরনের পদক্ষেপকে তিনি জনগণকে ‘বাচ্চাদের মুখে চুষনি দেওয়ার মতো’ সান্ত্বনা দেওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে ‘ফল’ নয়, ‘কারণ’ মেরামত করাই এখন সময়ের দাবি।

