শিক্ষা কোনো কূটনৈতিক প্রদর্শনীর বিষয় নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। একটি শিক্ষার্থীকে বিদেশে পাঠানো মানে শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ তৈরি করা নয়; বরং তাকে একটি নির্দিষ্ট শিক্ষা পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা, গবেষণার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করা। সব সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে নিম্নগামী একটি রাষ্ট্রে গিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা এমন কী শিখবে? – এই উদ্যোগ আমাদের শিক্ষার্থীদের কতটা এগিয়ে নেবে?
পাকিস্তানের সঙ্গে ‘নলেজ করিডোর’ গড়ে তোলার ঘোষণা প্রথম দেখায় একটি কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ৫০০টি পূর্ণ অর্থায়নের ‘আল্লামা ইকবাল স্কলারশিপ’ দেওয়ার বিষয়টি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের শিক্ষা নীতি কেবল সুযোগের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না; বিচার করতে হয় সেই সুযোগের মান, নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দিয়ে।
আর সেখানেই বড় প্রশ্ন তৈরি হয়, যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো গভীর সংকটে, যে দেশ নিজেই শিক্ষার মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারেনি, সেই দেশের সঙ্গে এমন শিক্ষা করিডোর বাংলাদেশের জন্য কতটা লাভজনক?
বরং পাকিস্তানের সঙ্গে ‘নলেজ করিডোর’ গড়ার ঘোষণা আপাতদৃষ্টিতে চমকপ্রদ মনে হলেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে আত্মঘাতী ফাঁদ।
বিশ্বমানের শিক্ষা কোথায়?
প্রথম প্রশ্নটি আসতে পারে পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে।
২০২৬ সালের কিউএস (QS) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, পাকিস্তানের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই বিশ্বের শীর্ষ ৩৫০-এর মধ্যে নেই। কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজি (NUST) তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও তারা এখনো বিশ্বের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
এখানে প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা যদি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য বিদেশে যেতে চায়, তাহলে পাকিস্তান কেন তাদের প্রথম সারির গন্তব্য হবে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেখানে গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের অসংখ্য সুযোগ রয়েছে, সেখানে পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে স্পষ্ট কৌশলগত ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
যে দেশের লাখো শিশু এখনো শিক্ষার বাইরে
পাকিস্তানের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার চিত্রও উদ্বেগজনক।
পাকিস্তানের সরকারি পরিসংখ্যান ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বিপুল সংখ্যক শিশু এখনো বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে ৫ থেকে ১৬ বছর বয়সী প্রায় ২ কোটি ৫১ লাখ শিশু স্কুলের বাইরে রয়েছে। কিছু বেসরকারি সংস্থার হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি।
বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেশটির শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার এবং শেখার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অনেক শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও মৌলিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে না।
পাকিস্তানের প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা রয়েছে। বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, দেশটির সাক্ষরতার হার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে প্রাথমিক শিক্ষা, নারী শিক্ষা এবং সাক্ষরতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, যে শিক্ষা খাতের মৌলিক সমস্যাগুলো পাকিস্তান এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি, সেই ব্যবস্থার কাছ থেকে বাংলাদেশ কী ধরনের জ্ঞান গ্রহণ করতে যাচ্ছে?
নিজেদের শিক্ষা বাজেট কমিয়ে অন্যকে জ্ঞান দেওয়ার সক্ষমতা?
শিক্ষার উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো বিনিয়োগ।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা খাতে কম বিনিয়োগের জন্য সমালোচিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশটির শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির তুলনায় অত্যন্ত কম।
ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী, একটি দেশের শিক্ষা খাতে জিডিপির প্রায় ৪ থেকে ৬ শতাংশ বিনিয়োগ করা উচিত। কিন্তু পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যয় সেই মানদণ্ডের অনেক নিচে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাকিস্তানের শিক্ষা বাজেট কমানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
যে দেশ নিজের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারছে না, সেই দেশ কীভাবে অন্য দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানসম্পন্ন শিক্ষা পরিবেশ তৈরি করবে- এটি একটি যৌক্তিক প্রশ্ন।
নারী শিক্ষার নিরাপত্তা ও বৈষম্যের প্রশ্ন
শিক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
২০২৫ সালের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টে ১৪৮টি দেশের মধ্যে পাকিস্তান সর্বশেষ অবস্থানে রয়েছে। একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর একটি।
পাকিস্তানে নারী শিক্ষার হার পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিভিন্ন প্রতিবেদনে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশ, সামাজিক বাধা এবং বৈষম্যের বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ থেকে কোনো শিক্ষার্থী, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থী, বিদেশে গেলে তার নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
স্কলারশিপের সংখ্যা দিয়ে এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
প্রশ্ন হলো, শুধু পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, নাকি একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষা পরিবেশও নিশ্চিত করা হচ্ছে?
নিরাপত্তার বাস্তবতা
পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়।
২০২৫ সালের গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্সে পাকিস্তান বিশ্বের অন্যতম বেশি সন্ত্রাসপ্রবণ দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়া ও বালুচিস্তানের মতো অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
যদি নলেজ করিডোরের আওতায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এসব অঞ্চলে থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
কারণ বিদেশে উচ্চশিক্ষা মানে শুধু ক্লাসরুম নয়; এর সঙ্গে যুক্ত জীবনযাপন, চলাচল এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও।
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক পরিবেশ
পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে।
ব্লাসফেমি আইন, ধর্মীয় উত্তেজনা এবং সামাজিক চাপের কারণে অনেক সময় সংখ্যালঘু ও ভিন্ন মতের মানুষ সমস্যার মুখোমুখি হন।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যদি সেখানে যায়, তাহলে তাদের জন্য এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি যেখানে তারা স্বাধীনভাবে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
ইতিহাসের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বাস্তবতা।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ইতিহাস বাংলাদেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষা সহযোগিতা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে হতে পারে, কিন্তু অতীতকে অস্বীকার করে নয়।
যে কোনো টেকসই সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত সত্য স্বীকার, পারস্পরিক সম্মান এবং আস্থার ওপর।
৫০০ স্কলারশিপ কি যথেষ্ট যুক্তি?
৫০০টি পূর্ণ অর্থায়নের স্কলারশিপ অবশ্যই একটি সুযোগ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোথায় পাঠানো হচ্ছে, কেন পাঠানো হচ্ছে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি লাভ কী?
একটি উন্নত শিক্ষা নীতি শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ায় না; বরং এমন জায়গায় পাঠায় যেখানে তারা বিশ্বমানের জ্ঞান অর্জন করে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফুলব্রাইট, যুক্তরাজ্যের কমনওয়েলথ, ইউরোপের এরাসমাস মুন্ডাস, জাপানের মেক্সট, দক্ষিণ কোরিয়ার কেজিএসপি কিংবা ভারতের আইসিসিআরের মতো অসংখ্য আন্তর্জাতিক সুযোগ বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে।
তাই প্রশ্ন ওঠে, এই সুযোগগুলো আরও সম্প্রসারণের পরিবর্তে পাকিস্তানকে কেন অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে?
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নাকি কূটনৈতিক বার্তা?
শিক্ষা কোনো রাজনৈতিক প্রতীক নয়। শিক্ষা হলো একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি।
একজন শিক্ষার্থীকে বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেখতে হবে – সে কী শিখবে, কোথায় থাকবে, কতটা নিরাপদ থাকবে এবং তার অর্জিত জ্ঞান দেশের কাজে কতটা লাগবে?
পাকিস্তানের সঙ্গে শিক্ষা সহযোগিতা যদি বাস্তব সুবিধা, গবেষণা ও মানসম্মত শিক্ষার ভিত্তিতে হয়, তবে সেটি অবশ্যই মূল্যায়নের বিষয়।
কিন্তু শুধুমাত্র কূটনৈতিক সৌজন্য বা আবেগের কারণে এমন একটি উদ্যোগ নেওয়া হলে তা বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আত্মঘাতী ফাঁদে পরিণত হতে পারে।
কারণ একটি ভুল শিক্ষা সিদ্ধান্তের ক্ষতি শুধু আজকের নয়- তার প্রভাব পড়ে একটি পুরো প্রজন্মের ওপর।
বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি নলেজ করিডোর, যা শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের জ্ঞান, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সুযোগের দিকে নিয়ে যাবে; এমন কোনো করিডোর নয়, যা তাদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়।

