বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সম্মাননার আলো ঝলমলে মঞ্চ, আর শ্রেণিকক্ষের পেছনে জমে থাকা বঞ্চনার হিসাব
প্রতি বছর ৫ অক্টোবর এলেই শিক্ষকদের নিয়ে রাষ্ট্রীয় বক্তৃতার ভাষা বদলে যায়। শিক্ষক হয়ে ওঠেন ‘জাতির কারিগর’, ‘আলোকবর্তিকা’, ‘মানুষ গড়ার কারিগর’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় শিক্ষকের ছবিতে শ্রদ্ধা আর আবেগের পোস্টে। মঞ্চে উঠে সবাই বলেন—শিক্ষকরাই জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন।
কিন্তু অনুষ্ঠান শেষ হলে?
শিক্ষক ফিরে যান সেই শ্রেণিকক্ষে। হাতে চক বা মার্কার, সামনে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ; আর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে মাথার ভেতর জমে থাকে বেতন, পদোন্নতি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, অবসরকালীন নিরাপত্তা ও চাকরির নিশ্চয়তার হিসাব।
যে মানুষটি অন্যের সন্তানকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করেন, রাষ্ট্র কি তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পেরেছে?
এই প্রশ্নটাই এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সবচেয়ে জরুরি।
২০২৬ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্যও শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের পেশাগত মর্যাদা সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণে তাঁদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছে। বাংলাদেশও দিবসটি উপলক্ষে ১০২ জন গুণী শিক্ষককে জাতীয় পর্যায়ে সম্মাননা দিয়েছে।
এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু একটি কঠিন প্রশ্ন থেকেই যায়—একশজন শিক্ষককে সম্মাননা দিলেই কি লাখ লাখ শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত হয়?
উত্তরটি সম্ভবত ‘না’।
কারণ সম্মাননা একটি স্বীকৃতি; মর্যাদা একটি কাঠামো।
একজন শিক্ষককে সম্মান করতে হলে শুধু ক্রেস্ট, সনদ কিংবা অর্থমূল্য দিলেই হবে না। তাঁকে এমন একটি বেতন কাঠামো দিতে হবে, যাতে মাসের শেষ সপ্তাহে সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে তাঁকে মানসিক চাপে পড়তে না হয়। এমন পদোন্নতি ব্যবস্থা দিতে হবে, যেখানে বছরের পর বছর একই পদে আটকে থেকে হতাশ হতে হবে না। এমন সামাজিক নিরাপত্তা দিতে হবে, যাতে অবসরের পর নিজের প্রাপ্য অর্থের জন্য দরজায় দরজায় ঘুরতে না হয়।
পদোন্নতি কি কেবল ফাইলের বিষয়?
বাংলাদেশের শিক্ষকসমাজের বড় সংকটগুলোর একটি দীর্ঘসূত্রতা। পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, এমপিও, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা সুবিধা কিংবা অবসরকালীন পাওনা—বিভিন্ন স্তরে শিক্ষকদের এসব দাবি বছরের পর বছর ঘুরপাক খায়।
এমনকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যেও দীর্ঘদিনের পদোন্নতি ও গ্রেডসংক্রান্ত অসন্তোষ রয়েছে। শিক্ষকদের বিভিন্ন দাবির মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেড নিশ্চিত করার প্রশ্নটি বারবার সামনে এসেছে।
এখানেই রাষ্ট্রের সঙ্গে শিক্ষকের সম্পর্কের একটি অস্বস্তিকর চিত্র ফুটে ওঠে।
শিক্ষার্থীকে সময়মতো পরীক্ষা দিতে হয়, ফল দিতে হয়, ক্লাসে উপস্থিত থাকতে হয়। কিন্তু শিক্ষকের ন্যায্য পাওনা দেওয়ার সময় রাষ্ট্রের ঘড়ি এত ধীর কেন?
এমপিওর বাইরেও আছে আরেক বাংলাদেশ
শিক্ষকদের সংকটের সবচেয়ে নির্মম চিত্র দেখা যায় নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে।
হাজার হাজার শিক্ষক এমন প্রতিষ্ঠানে পাঠদান করছেন, যেখানে প্রতিষ্ঠানের এমপিও না থাকায় তাঁরা নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতার আওতায় নেই। সাম্প্রতিক তথ্যে এমন ৩ হাজার ৬১৫টি প্রতিষ্ঠানের কথা উঠে এসেছে, যেগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত।
অর্থাৎ একজন শিক্ষক প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের বলেন—‘তোমাদের ভবিষ্যৎ আছে।’
অথচ তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ?
সেটি অনেক সময় নির্ভর করছে প্রতিষ্ঠানটি কবে এমপিও পাবে, আদৌ পাবে কি না—তার ওপর।
এটি শুধু শিক্ষকের সমস্যা নয়। এটি শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা।
বেতন শুধু টাকা নয়, এটি মর্যাদার রাষ্ট্রীয় ঘোষণা
শিক্ষকের বেতনকে কেবল মাসিক আয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বেতন একটি রাষ্ট্রীয় বার্তা—এই পেশাকে রাষ্ট্র কতটা মূল্য দেয় তার অন্যতম পরিমাপক।
২০২৬ সালের নতুন পে-স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদেরও অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত এসেছে। এটি দীর্ঘদিনের বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
কিন্তু একই সঙ্গে দেখতে হবে—বেতন কাঠামোর পাশাপাশি বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, অবসর সুবিধা ও অন্যান্য ভাতা শিক্ষকের জীবনযাত্রার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কারণ কাগজে বেতন বাড়লেই জীবনযাত্রার মান বাড়ে না।
শিক্ষকের অধিকার থাকবে, জবাবদিহিও থাকবে
শিক্ষকদের অধিকার নিয়ে কথা বলার সময় আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট হওয়া দরকার।
শিক্ষকের ন্যায্য বেতন ও মর্যাদা যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি নিশ্চিত করতে হবে পেশাগত দক্ষতা, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি, নৈতিকতা ও জবাবদিহি।
কয়েকজন শিক্ষকের অনৈতিক কর্মকাণ্ড দিয়ে পুরো শিক্ষকসমাজকে বিচার করা যেমন অন্যায়, তেমনি ‘শিক্ষক’ পরিচয়কে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রাখাও সমান ভুল।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা যেখানে—
যোগ্য শিক্ষক পুরস্কৃত হবেন, অযোগ্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ পাবেন এবং গুরুতর অনিয়মকারী শিক্ষক জবাবদিহির আওতায় আসবেন।
শিক্ষককে রাজপথে নয়, শ্রেণিকক্ষে দেখতে চায় দেশ
শিক্ষকের দাবি আদায়ের জায়গা হওয়া উচিত আলোচনার টেবিল, রাজপথ নয়।
কিন্তু যখন ন্যায্য দাবি বছরের পর বছর পড়ে থাকে, তখন শিক্ষক কেন রাস্তায় নামেন—এই প্রশ্নের পাশাপাশি রাষ্ট্রকেও জিজ্ঞেস করতে হবে, কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হলো যে শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে দাবি আদায়ের জন্য রাস্তায় দাঁড়াতে হচ্ছে?
একটি সভ্য রাষ্ট্রের শিক্ষকের হাতে থাকার কথা বই, কলম ও গবেষণার উপকরণ।
দাবির ব্যানার নয়।
সম্মাননার পাশাপাশি দরকার ‘শিক্ষক নীতি’
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের আনুষ্ঠানিকতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের সূচনা করবে।
প্রয়োজন—
• শিক্ষকদের জন্য স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ পদোন্নতি ব্যবস্থা;
• সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য কমানো;
• নন-এমপিও শিক্ষকদের জন্য বাস্তবসম্মত আর্থিক নিরাপত্তা;
• বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা বাস্তব জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা;
• অবসর ও কল্যাণ সুবিধা দ্রুত নিষ্পত্তি;
• নিয়মিত পেশাগত প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ;
• নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কমানো;
• একই সঙ্গে শিক্ষকদের জন্য কার্যকর জবাবদিহি ব্যবস্থা।
সরকার ২০২৬ সালে গুণী শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননার পরিধি বাড়িয়েছে—এটি ইতিবাচক বার্তা। কিন্তু সম্মাননার তালিকা যত বড়ই হোক, শিক্ষকসমাজের কাঠামোগত বঞ্চনা যদি একই থাকে, তাহলে সেই সম্মাননা কেবল ব্যতিক্রমকে পুরস্কৃত করবে; সমস্যার সমাধান করবে না।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই ফুল, শুভেচ্ছা আর ফেসবুক পোস্টের বাইরে গিয়ে একটি প্রশ্ন করা দরকার—
যে শিক্ষক আমাদের সন্তানকে মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেন, রাষ্ট্র কি তাঁকে মানুষ হিসেবে বাঁচার নিশ্চয়তা দিতে পেরেছে?
শিক্ষককে ‘জাতির কারিগর’ বলা খুব সহজ।
কিন্তু একজন কারিগরকে সম্মানজনক জীবন দেওয়ার মতো রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি করাই আসল পরীক্ষা।
৫ অক্টোবরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই একটাই—
শিক্ষকের হাতে শুধু জাতির ভবিষ্যৎ নয়; শিক্ষকের ভবিষ্যৎও রাষ্ট্রের হাতে।
আর সেই ভবিষ্যৎ যদি অনিশ্চিত থাকে, তাহলে জাতি গড়ার বক্তৃতা যতই জোরালো হোক—শিক্ষাব্যবস্থার ভিত ততটাই দুর্বল থেকে যাবে।

