কারিকুলাম ও মূল্যায়ন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা যেন শেষ হয় না। প্রতি বছরই শিক্ষার্থীদের ওপর নতুন কিছু পদ্ধতি চাপানো হচ্ছে, যা কয়েক মাসের মধ্যেই বাতিল হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার্থীরা আক্রান্ত হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় চাপ ও অনিশ্চয়তায়।
এবারও সেই একই পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিমধ্যেই এ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারীর স্বাক্ষরিত একটি চিঠি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর পাঠানো হয়। চিঠিতে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক স্তরে প্রযোজ্য মূল্যায়ন নির্দেশিকা এবং প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বিস্তারিত নির্দেশিকা সংযুক্ত করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, এই নির্দেশিকা তৈরি হয়েছে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে। এতে শ্রেণি শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, পিটিআই ও ইউপিইটিসি ইনস্ট্রাক্টর, সহকারী ও থানা শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির প্রতিনিধি, এনসিটিবির বিশেষজ্ঞ, জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সদস্যসহ একাডেমিক এবং মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছেন। মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে শেখা নিশ্চিত করা এবং সুষ্ঠুভাবে মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী কালের কণ্ঠকে বলেন, “আমরা মন্ত্রণালয়ে একটি মূল্যায়ন নির্দেশিকা পাঠিয়েছি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ের।”
অভিভাবকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, ২০২৩ সালে চালু হওয়া নতুন কারিকুলামে পরীক্ষা ছিল প্রায় নেই। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চাপ কমলেও, অভিভাবকদের প্রতিদিন নতুন শিক্ষা উপকরণ কিনতে হতো। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার পুরনো ২০১২ সালের কারিকুলাম থেকে কিছুটা পরিবর্তন করে ২০২৪ সালের আগস্টে পুনরায় চালু করে। এখন যদি নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি ফের চালু হয়, তা শিক্ষার্থীদের জন্য বুমেরাংয়ের মতো প্রভাব ফেলবে।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, “জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আমরা শিক্ষায় কোনো হঠকারী পরিবর্তন চাই না। আমাদের সন্তানদের আমরা আর ‘গিনিপিগ’ বানাতে চাই না।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নতুন নির্বাচিত সরকারের শিক্ষাপ্রণালী আলাদা হতে পারে এবং তারা ২০১২ সালের কারিকুলাম আরও যুগোপযোগী করবেন। এ ছাড়া এনসিটিবি ২০২৭ সালের জন্য নতুন কারিকুলাম ও মূল্যায়ন নিয়ে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। তাই মাত্র এক বছরের জন্য নতুন পদ্ধতি চালু করা শিক্ষার্থীদের জন্য অপ্রয়োজনীয় চাপ ও কয়েকশ কোটি টাকার অর্থ অপচয় হিসেবে ধরা যেতে পারে।
মূল্যায়ন নির্দেশিকায় পরিবর্তন:
-
প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ধারাবাহিক শ্রেণি কার্যক্রমের পাশাপাশি সামষ্টিক মূল্যায়ন (লিখিত পরীক্ষা) যোগ করা হয়েছে।
-
তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে শ্রেণি মূল্যায়ন ও সামষ্টিক মূল্যায়নের সঙ্গে ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা সংযোজন করা হয়েছে।
-
প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে ৫০ নম্বর ধারাবাহিক ও ৫০ নম্বর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় রাখা হয়েছে। অন্যান্য বিষয়গুলোতে ২৫ নম্বর ধারাবাহিক এবং ২৫ নম্বর সামষ্টিক।
-
তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, বিজ্ঞান ও ধর্ম শিক্ষা বিষয়গুলোর জন্য ১০০ নম্বরের মধ্যে ৩০ ধারাবাহিক এবং ৭০ সামষ্টিক। শিল্পকলা ও শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষায় ৫০ নম্বরের মধ্যে ১৫ ধারাবাহিক এবং ৩৫ সামষ্টিক।
অভিজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রোজার কারণে শিক্ষাপ্রকল্পের কাজ দুই মাস ব্যাহত হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য তিন-চার মাস সময় প্রয়োজন, ফলে পুরো মূল্যায়ন বাস্তবায়ন করতে অন্তত ছয় মাস লাগবে। ২০২৭ সালে নতুন কারিকুলাম চালু হলে পুরনো পদ্ধতি বাতিল হবে। ফলে শিক্ষার্থীরা আবারও ‘গিনিপিগ’ হবে, এবং প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রমের জন্য ব্যয়কৃত অর্থ অপচয় হবে।
এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আগ্রহেই নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে। আমরা এই মুহূর্তে কোনো বিরোধের মুখোমুখি হতে চাই না। নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করার সময় এখন ঠিক নয়।”
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, “মূল্যায়ন নির্দেশিকা এখনও খসড়া পর্যায়ে। নির্বাচনের আগে নতুন সরকারের পরিকল্পনা ভিন্ন হতে পারে। আমরা শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হতে দেব না এবং বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করব।”

