প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নের নামে নতুন করে ৪৫ হাজার কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প নিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। পিইডিপি-৪ এখনো শেষ হয়নি। তার মধ্যেই অর্থনৈতিক সংকটের সময় এমন বড় বাজেটের আরেকটি কর্মসূচি নেওয়ায় নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, আগামী পাঁচ বছরে বিদ্যমান উন্নয়ন প্রকল্পের বাইরে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, “প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি–পিইডিপি-৫” এর লক্ষ্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য ও টেকসই প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। তাদের দাবি, এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিটি শিশু বাংলা ও গণিতে শক্ত ভিত্তি পাবে এবং একুশ শতকের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করবে।
তবে প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাব (ডিপিপি), ব্যয় কাঠামো, আগের প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক শিক্ষার সূচক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। প্রশ্ন উঠছে, এই প্রকল্প সত্যিই কি শেখার সংকট কাটাতে পারবে, নাকি আগের ব্যয়বহুল কিন্তু ফলহীন প্রকল্পগুলোর পুনরাবৃত্তি হবে।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় ধরনের গাফিলতি রয়েছে। তার ভাষায়, “প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু অবকাঠামো হচ্ছে, কিন্তু শিশুরা কিছু শিখছে না। পিইডিপি-৫ আরএডিপি করার শেষ সময় পাঠানো হয়েছে। কিন্তু কোনো পরিকল্পনা নেই।”
পিইডিপি-৫ এর মাধ্যমে শেখার দীর্ঘদিনের ঘাটতি দূর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে ৯৪.৫৫ শতাংশ নিট ভর্তি হারকে শতভাগে উন্নীত করা, সমাপনী হার ৮৪ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশের বেশি করা এবং প্রায় দুই লাখ ঝরে পড়া বা স্কুলের বাইরে থাকা শিশুকে আবার শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রকল্পটির ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে পাঠিয়েছে। পরিকল্পনা বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এনইসির সর্বশেষ বৈঠকে সংশোধিত এডিপিতে অনুমোদনবিহীন প্রকল্পের তালিকায় পিইডিপি-৫ অন্তর্ভুক্ত করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩০ হাজার কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে আসবে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আসবে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, ইউনিসেফ, জাইকা, জিপিই ও ইউনেসকোসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল এই কর্মসূচি। ফলে নতুন করে বৈদেশিক ঋণের বোঝা বাড়বে।
ডিপিপিতে তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলায় ৭০ শতাংশ এবং গণিতে ৬০ ও ৫০ শতাংশ দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত করা, ঝরে পড়ার হার ১৬.২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ৮৭.৪৫ শতাংশ থেকে ৯৩ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একক শিফট স্কুলে পাঠদানের সময় ২০ শতাংশ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
কাগজে-কলমে এই লক্ষ্যগুলো উচ্চাভিলাষী হলেও বাস্তবে আগের পিইডিপি প্রকল্পগুলোতে একই ধরনের প্রতিশ্রুতি ছিল। গত এক যুগে পিইডিপি-৩ ও ৪ এ প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা ব্যয় হলেও শেখার মানে তেমন উন্নতি হয়নি।
বাংলাদেশ এমআইসিএস ২০২৫ জরিপে দেখা গেছে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির অধিকাংশ শিক্ষার্থী পড়া ও গণিতে পিছিয়ে আছে। মাত্র ২৪ শতাংশ শিশুর প্রাথমিক পাঠ দক্ষতা রয়েছে। একটি ছোটগল্পের ৯০ শতাংশ শব্দ সঠিকভাবে পড়তে পারে মাত্র ৩৯ শতাংশ শিশু। মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে প্রায় ৩০ শতাংশ। গণিতে অবস্থাও উদ্বেগজনক। মাত্র ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর মৌলিক সংখ্যাজ্ঞান রয়েছে। যোগ-বিয়োগ করতে পারে ৩৬ শতাংশ এবং সংখ্যা পড়তে পারে ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থী।
ডিপিপির ব্যয় কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, বড় অংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে অবকাঠামো নির্মাণে। সারা দেশে ২৫ হাজার একক শিফট স্কুল বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণ, ওয়াশ সুবিধা, নিরাপদ পানি, বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু নন-রেসিডেনশিয়াল বিল্ডিং নির্মাণেই বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষভিত্তিক সহায়তা ও শেখার ফলাফল মূল্যায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর পরিকল্পনা স্পষ্ট নয়। ডিপিইডি প্রশিক্ষণের কথা বলা হলেও অতীত প্রকল্পে প্রশিক্ষণের বাস্তব ফল ছিল সীমিত।
ডিপিপিতে বিকেন্দ্রীকরণ ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পিইডিপি-৪ এর অভিজ্ঞতা বলছে, ডেটা থাকলেও তা কাজে লাগানো হয়নি। কেন্দ্রীয়ভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে স্থানীয় বাস্তবতা উপেক্ষিত থেকেছে।
সমতা ও অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নেও প্রকল্পটি দুর্বল। পাহাড়ি অঞ্চল, চরাঞ্চল, বস্তি ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষ কৌশলের কথা বলা হলেও বাজেটে তার প্রতিফলন নেই।
পিইডিপি-৪ এর মূল্যায়নে দেখা গেছে, অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও শেখার মান বাড়েনি। প্রায় ১৬ শতাংশ অর্থ অব্যবহৃত থেকে গেছে। শিক্ষক সক্ষমতা ও শ্রেণিকক্ষভিত্তিক সহায়তার ঘাটতি রয়ে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, প্রশাসনিক মনিটরিং থাকলেও শিক্ষাগত মনিটরিং দুর্বল। তার মতে, গত দেড় দশকে নেওয়া অধিকাংশ শিক্ষা প্রকল্প ছিল রাজনৈতিক বিবেচনায়। ফলে ভবন নির্মাণ হলেও শিক্ষার মান বাড়েনি।
ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, “মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়।”

