নতুন বছর ঘুরতেই বই, খাতা, কলম, পেন্সিল, স্কুল ব্যাগসহ শিক্ষাসামগ্রীর দাম বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। গত বছরের শুরুতে ডজনের পেন্সিল ৮০ টাকায় পাওয়া যেত। এবার তা কিনতে হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। সাধারণ মানের ৫০০ টাকার স্কুল ব্যাগের দাম বেড়ে ৮০০ টাকার ওপরে। বইয়ের দামও আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে সন্তানদের জন্য শিক্ষাসামগ্রী কিনতে অভিভাবকরা বাড়তি চাপে পড়ছেন। বিশিষ্টজনরা আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার হার বাড়তে পারে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) এক সমীক্ষা জানিয়েছে, শিক্ষা খাতে বাড়তি খরচের কারণে অনেক পরিবারকে ঋণ নিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা চালাতে হচ্ছে। দৈনন্দিন প্রয়োজনও অনেককেই কমাতে হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ছিল ১৩.১৫ শতাংশ। তা বেড়ে ১৬.২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর্থিক সংকটে অনেক পরিবার সন্তানদের পড়াশোনা বাদ দিয়ে অল্প বয়সে শ্রমবাজারে পাঠাচ্ছে।
চট্টগ্রামের চকবাজার মোড়ের শাহেনশাহ মার্কেটে শিক্ষাসামগ্রী বিক্রির একটি দোকানে আধঘণ্টা ঘুরে কিছু কিনে বের হচ্ছিলেন মুরাদপুরের বাসিন্দা আহসান সুমন। তিনি জানান, ‘দুই ছেলেমেয়ের জন্য দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির বই, খাতা, পেন্সিলসহ কিছু কিনতে এসেছিলাম। সবকিছুর দাম বেড়েছে। ছোট পাঁচ-ছয়টি বইয়ের জন্য দুই হাজার টাকা চাইছে। আমি দারোয়ানের চাকরিতে ১২ হাজার টাকা পাই, স্ত্রী কারখানায় ৮ হাজার টাকার বেতন পান। সামান্য আয়ে সংসার চললেও এই খরচে পড়ালেখা করানো কঠিন।’
আন্দরকিল্লা মোড়ে চাকরিজীবী সোনিয়া ইসলাম বলেন, ‘নতুন বছর অনেকের জন্য স্বস্তি হলেও আমাদের মতো নিম্ন মধ্যবিত্তদের জন্য অভিশাপ। গত বছরের জানুয়ারিতে তৃতীয় শ্রেণির বই কিনেছিলাম ৮৫০ টাকায়। এবার একই বই ১,৩০০ টাকার ওপরে।’
নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজারে স্কুল ব্যাগ কিনতে গিয়ে ইফতেখার হোসেন রাকিল বলেন, ‘চতুর্থ শ্রেণির মেয়ের জন্য স্কুল ব্যাগ কিনতে এসেছি। ৮০০ থেকে এক হাজার টাকার নিচে মাঝারি মানের কোনো ব্যাগ নেই।’ অন্য অভিভাবক সানজিদা খাতুন বলেন, ‘চাল, ডাল, তেলসহ সব ভোগ্যপণ্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। এর ওপর স্কুল ব্যাগসহ সবকিছুর দাম বেড়ে গিয়েছে। প্লে থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি ফি বাবদ পাঁচ হাজার টাকার বেশি খরচ পড়ছে। এই বাড়তি খরচ অনেকের জন্য বড় চাপে পরিণত হয়েছে।’
বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণির বইয়ের দামও বেড়েছে। সামান্য কয়েক পৃষ্ঠার বই কিনতে হচ্ছে ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা। শিশু শ্রেণির ১০–১৫ পৃষ্ঠার বইয়ের দাম এখন ১৮০–২২০ টাকা, যা আগের বার ছিল ১৩০–১৫০ টাকা। ২০–৩০ পৃষ্ঠার খাতার দাম বেড়ে ৫০ টাকা। পাঁচ-সাত টাকায় বিক্রি হওয়া বলপয়েন্ট কলমের দাম বেড়ে ১০–১২ টাকা। মাঝারি মানের জ্যামিতি বক্স ১৬০–২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্লাস্টিকের ফোল্ডার, রাবার, পরীক্ষা বোর্ড, আর্ট পেপার, শার্পনারসহ প্রায় সব সরঞ্জামের দাম বেড়েছে।
শাহেনশাহ মার্কেটের নিউ একাডেমিক লাইব্রেরির স্বত্বাধিকারী রাজীব দে বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় সব শিক্ষাসামগ্রীর দাম বেড়েছে। অনেকেই বই-খাতা কিনতে এসে ক্ষোভ দেখাচ্ছেন। আমরা কিছু করতে পারি না। কারণ দাম বাড়াচ্ছেন বড় ব্যবসায়ীরা।’ মেসার্স মা লাইব্রেরির ব্যবস্থাপক মাহবুব হোসেন বলেন, ‘ছোট সাইজের বই থেকে সবকিছুর দাম বেড়েছে। ফলে অভিভাবকরা বিপাকে পড়ছেন।’
রিয়াজউদ্দিন বাজারের তামাকুমন্ডি লেন বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক জানান, ‘বছরের ব্যবধানে সব সামগ্রীর দাম বেড়েছে। বিশেষ করে স্কুল ব্যাগ। কারণ এর উপকরণের দাম বেড়েছে।’ আন্দরকিল্লা ব্যবসায়ী সমিতির নেতা মো. মান্নান বলেন, ‘বই, খাতা, কলম, পেন্সিল, জ্যামিতি বক্সসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। মূল কারণ প্রতিটি উপকরণের দাম বাড়া।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম শাখার সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু আয়ের সুযোগ কম। এতে অনেক পরিবার পড়াশোনা করাতে আগ্রহ হারাচ্ছে। অবস্থা এমন থাকলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বাড়বে।’
কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বেশ কয়েক দফায় দাম বেড়েছে। ভোগ্যপণ্য এখন ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। নতুন বছরে আয়ের সুযোগ না বাড়লেও খরচ বেড়েছে। প্রশাসনের দিক থেকে নজরদারি নেই।’

