অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে এসে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়ায় হঠাৎ করেই গতি বেড়েছে। নন-এমপিও স্কুল ও কলেজগুলোকে এমপিওভুক্ত করার লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রথম ধাপে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ চেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে। এই দ্রুতগতির উদ্যোগ ঘিরে প্রশাসনের ভেতরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত কি যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই নেওয়া হচ্ছে?
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে মোট ১ হাজার ৭১৯টি নন-এমপিও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৬৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের শেষ তিন মাসের জন্য প্রয়োজন হবে ১৬৭ কোটি টাকা।
তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এমপিওভুক্তির আবেদন গ্রহণ শেষ হওয়ার মাত্র ছয় কর্মদিবসের মধ্যেই প্রায় পৌনে দুই হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করে অর্থ বরাদ্দ চাওয়া কার্যত ‘তাড়াহুড়োর নামান্তর’। তাঁদের মতে, এত অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করা বাস্তবসম্মত নয়।
যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই অভিযোগ পুরোপুরি মানতে নারাজ। তাদের দাবি, এমপিওভুক্তির জন্য এখনো কোনো চূড়ান্ত তালিকা তৈরি হয়নি। সম্ভাব্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি সংখ্যা ধরে অর্থ বিভাগের কাছে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে মাত্র। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া এখনো চলমান এবং অর্থ বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষেই যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চূড়ান্ত করা হবে।
এমপিও বা মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার ব্যবস্থার আওতায় সরকার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করে। এর পাশাপাশি তাঁরা বিভিন্ন ধরনের সরকারি ভাতার সুবিধাও পান। ফলে এমপিওভুক্তি শুধু প্রশাসনিক নয়, আর্থিক দিক থেকেও একটি বড় সিদ্ধান্ত।
এই প্রক্রিয়ার পটভূমিতে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২৫’ প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করে। নতুন নীতিমালায় স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির সুযোগ রাখা হয় এবং এমপিওভুক্তির সূচকেও পরিবর্তন আনা হয়।
এই নীতিমালার আওতায় চলতি বছরের ১৪ থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত অনলাইনে নতুন স্কুল ও কলেজ এমপিওভুক্তির আবেদন গ্রহণ করা হয়। এরপর আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হলেও এখনো নন-এমপিও মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আবেদন গ্রহণ শুরু হয়নি।
সূত্র জানায়, ৩ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে পাঠানো এক চিঠিতে অর্থ বিভাগের সম্মতি চাওয়া হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, এমপিও নীতিমালার প্যাটার্ন অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বছরে মোট ৬৭০ কোটি ১৩ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে।
চিঠিতে প্রথম ধাপে এমপিওভুক্তির জন্য ১ হাজার ৭১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ৪৭১টি নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য ১৮৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, ১৪৫টি উচ্চমাধ্যমিক কলেজের জন্য ১২৭ কোটি ১১ লাখ টাকা, ২৩২টি স্নাতক (সম্মান) কলেজের জন্য ১২৫ কোটি টাকা, ৬২৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৯২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, ১৩৫টি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য ১০২ কোটি ২২ লাখ টাকা এবং ২৩২টি স্নাতক (পাস) কলেজের জন্য ৩৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নথি ঘেঁটে জানা যায়, সর্বশেষ ২০২৩ সালে কয়েক ধাপে নন-এমপিও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এর আগে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তিতে ১০ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করা হয়। দীর্ঘ আট মাস পর ২০২৩ সালের মে মাসে সেই এমপিওভুক্তির ঘোষণা আসে।
বর্তমানে সারা দেশে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় ৩২ হাজার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে প্রায় ৭ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো এমপিও সুবিধার বাইরে।
এই দীর্ঘ অপেক্ষার কারণেই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্তির দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে তাঁরা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে টানা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। ১৭ দিন পর ১২ মার্চ শিক্ষা উপদেষ্টা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার আশ্বাস পেয়ে আন্দোলন স্থগিত করেন। পরে ২ নভেম্বর আবার আন্দোলন শুরু হয় এবং ৩ নভেম্বর থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি চলে। ৯ নভেম্বর সচিবালয়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এদিকে মাউশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, আবেদন গ্রহণ শেষ হওয়ার ছয় কর্মদিবসের মধ্যে ৩ হাজার ৬১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য নির্ভুলভাবে যাচাই করা প্রায় অসম্ভব। দিনে গড়ে ৬০০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাইয়ের দাবি ‘অস্বাভাবিক’ বলেই তাঁদের ধারণা।
তাঁদের মতে, এমপিওভুক্তির মতো আর্থিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাড়াহুড়ো করে নেওয়ার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়লগ্নে এমন তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে ভুল বা অসঙ্গতি থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এ বিষয়ে জানতে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল আবরার (সি আর আবরার) ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা সাড়া দেননি।
তবে গত বছরের ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক সি আর আবরার বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সারা দেশে সাধারণ ও কারিগরি মিলিয়ে ২ হাজার ৬০০টির বেশি উপযোগী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করে যেতে চায়।
এমপিওভুক্তকরণ যাচাই-বাছাই কমিটির আহ্বায়ক ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বেসরকারি-১) মো. মিজানুর রহমান বলেন, এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কোনো চূড়ান্ত তালিকা এখনো হয়নি। যাচাই-বাছাই চলছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ে শুধু সম্ভাব্য যোগ্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বরাদ্দ চেয়েছি। অর্থ মন্ত্রণালয় যদি বরাদ্দ দেয়, তাহলে যাচাই-বাছাই করে যোগ্য প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করা হবে।’ এত কম সময়ে তালিকা তৈরির বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি জানান, পুরো প্রক্রিয়াটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হয়েছে। কবে নাগাদ চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যাচাই-বাছাইয়ে সময় লাগবেই।

